× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মোস্তাফিজুর রহমান সুমন

প্রকাশিত: এপ্রিল ১১, ২০২৬, ১২:১১ এএম

জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানের এক মাস এখনো ভয় উৎকণ্ঠা

মোস্তাফিজুর রহমান সুমন

প্রকাশিত: এপ্রিল ১১, ২০২৬, ১২:১১ এএম

জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানের এক মাস  এখনো ভয় উৎকণ্ঠা

সিনেমার কাহিনির মতো গ্যাংস্টার কালচার বা সাম্রাজ্য নামেই পরিচিত জঙ্গল সলিমপুর। বাস্তবে সন্ত্রাসীদের দীর্ঘদিনের ‘দুর্ভেদ্য সাম্রাজ্য’ জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় একের পর এক অপরাধ ঘটে গেলেও প্রশাসন নিশ্চুপ ছিল। মাসখানেক আগে অপরাধী ধরতে অভিযানে র‌্যাব সদস্যদের হামলা এবং এ ঘটনায় এক র‌্যাব সদস্য নিহত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। এরপরই অভিযান চালায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। যৌথ বাহিনী চট্টগ্রামের সীতাকু- উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় ব্যাপক অভিযান চালিয়ে প্রশাসনের ‘নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার’ পর পেরিয়েছে এক মাস।

এক মাস আগের সেই দিনভর বিশেষ অভিযানে জঙ্গল সলিমপুরের অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণকারীদের ধরতে না পারলেও দীর্ঘদিন পর ওই এলাকার ‘নিয়ন্ত্রণ’ নিতে পারাকে ‘অর্জন’ হিসেবে দেখে পুলিশ ও প্রশাসন। তবে সেখানকার অপরাধ কর্মকা-ের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ ইয়াছিন ও রোকন উদ্দিন ধরা পড়েনি এ অভিযানে। তিন হাজারের বেশি সদস্যদের নিয়ে অভিযানের পর দুর্গম ওই এলাকার সরকারি জমিতে গড়ে তোলা আবাসিক এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে যৌথ বাহিনী। প্রশাসন অভিযানের পর থেকে জঙ্গল সলিমপুরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার কথা বললেও স্থানীয়রা বলছেন উল্টো। স্থানীয়দের দাবি, এখনো সলিমপুর ও আলীনগর এলাকার ‘অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ’ রয়ে গেছে দখলদারদের হাতে। ফলে প্রশাসন যতই বলুক, সলিমপুরে সন্ত্রাসীরা আর নেই, তবু ভয় ও উৎকণ্ঠা তাদের পিছু ছাড়ছে না।

গত ৯ মার্চ যৌথ বাহিনীর ওই অভিযানে অস্ত্র ও বিস্ফোরকসহ ১২ জনকে আটকের তথ্য দিয়েছিল জেলা পুলিশ। কিন্তু সরকারি জমি বিক্রি, পাহাড় কাটা, সন্ত্রাস, অস্ত্রবাজিসহ সেখানকার যাবতীয় অপরাধ কর্মকা-ের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ ইয়াছিন ও রোকন উদ্দিন রয়ে গেছেন অধরা। আলীনগরে এখনো ইয়াছিন বাহিনীর বিরুদ্ধে এলাকার কেউ সরাসরি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। স্থানীয়দের দাবি, জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকা কয়েকটি ‘সমাজে’ বিভক্ত হয়ে একাধিক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে আলীনগরের ‘রাজা’ এখনো ইয়াছিন। এলাকার ‘অদৃশ্য’ নিয়ন্ত্রণ রয়ে গেছে র‌্যাব সদস্য হত্যা মামলার এই প্রধান আসামির হাতে।

গত ১৯ জানুয়ারি র‌্যাবের একটি দল কয়েকটি মাইক্রোবাসে করে অভিযানে যায় জঙ্গল সলিমপুরে। সেখানে ‘মাইকে ঘোষণা’ দিয়ে র‌্যাব সদস্যদের ঘিরে তিনজনকে আটকে ফেলে স্থানীয়রা। তাদের পিটুনিতে নিহত হন র‌্যাবের উপসহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। এরপর সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর বিষোদ্গার করে বক্তব্য দিতে দেখা যায় ইয়াছিনকে; যা বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এসেছে। ওই ঘটনার প্রায় দুই মাস পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে সেনাবাহিনী-বিজিবি-র‌্যাব-পুলিশ যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। এর পর থেকে এলাকাছাড়া ইয়াছিন ও তার অনুসারীরা।

অভিযানের পরদিন সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজি ও বর্তমানে র‌্যাব মহাপরিচালক আহসান হাবিব পলাশ বলেছিলেন, ২০০৩ সাল থেকে প্রায় ৩১০০ একর খাসজমির আনুমানিক ৩৪টি পাহাড় কেটে লক্ষাধিক মানুষের মধ্যে জমি ক্রয়-বিক্রয়, নিজস্ব রাস্তা নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে তোলা, প্রশাসনকে পাশ কাটিয়ে অপরিকল্পিত ও অস্বাস্থ্যকর উপায়ে কীভাবে অবকাঠামো গড়ে তোলা যায়, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ জঙ্গল সলিমপুর।

প্রশাসনিক কাঠামোতে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান সীতাকু- উপজেলায় হলেও ওই এলাকায় প্রবেশ করতে হয় চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানার বাংলাবাজার এলাকা দিয়ে। বায়েজিদ লিংক রোড দিয়ে ভাটিয়ারি যাওয়ার পথে ডান দিকে পাহাড়-জঙ্গলঘেরা দুর্গম স্থান এই সলিমপুর। স্থানীয় লোকজনদের ভাষ্য, ২০০২-০৩ সাল থেকে সেখানে বসতি শুরু হয়। জঙ্গল সলিমপুরের পুরো ছিন্নমূল এলাকাকে ১১টি ‘সমাজে’ ভাগ করা হয়েছে ব্যবস্থাপনার সুবিধার জন্য। আর আলীনগর এলাকাটি ‘আলীনগর বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে পরিচালিত হলেও তার পুরা নিয়ন্ত্রণ ইয়াছিনের হাতে।

মূলত এই সমিতি দেখাশোনা করেন ইয়াছিনের ছোট ভাই ওমর ফারুক ও ভাগ্নে আনোয়ার। এ ছাড়া রয়েছেন নুরুল হক ভা-ারি, মোর্শেদ, কালা ফারুক, মেহেদী হাসান নামে আরও কয়েকজন। যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর তারাও সবাই গা-ঢাকা দিয়েছেন। এলাকাবাসীর দাবি, একসময় জঙ্গল সলিমপুরের ওই অংশে এসে বসতি স্থাপন করেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছিন্নমূল মানুষ। তবে বর্তমানে সেখানে নি¤œ আয়ের মানুষের পাশাপাশি উচ্চবিত্তরাও জায়গা নিয়েছেন। যাদের মধ্যে আছে সরকারি কর্মকর্তারাও। ছিন্নমূল এলাকার গলাচিপা পাহাড় পার হয়ে আগে একটি বড় লোহার গেট ছিল। আগে বহিরাগত কেউ ওই গেটের ভেতর যেতে পারত না। এলাকার নিয়ন্ত্রকদের ছিল নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী। তবে গত মাসে যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর গেটটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে প্রবেশের সময় কোনো বাধার মুখোমুখি হতে হয় না।

আলীনগরে বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য মতে, এই এলাকায় কোনো দল বা প্রশাসন নেই। কোনো চুরি-চামারিও নাই। আলীনগরের ‘রাজা’ একজনই, তার নাম ইয়াছিন। আলীনগরের সব কিছু এখনো চলে ইয়াছিনের ‘ইশারায়’। এখানে প্লট কেনাবেচায় কোনো কাগজপত্র লাগে না। ইয়াছিনের মুখের কথাই সব। এখানে প্লটগুলো হিসাব করা হয় চার গ-ায় (আট শতক)। প্লটের দাম নির্ধারণ করা হয় অবস্থান বুঝে। বর্তমানে সড়কের পাশের প্লট বিক্রি হচ্ছে ৩০ লাখ টাকায়। যেখানে যোগাযোগব্যবস্থা নেই সেসব পাহাড় টিলা কেনাবেচা হয় দেড় থেকে দুই লাখ টাকায়। সেখানে নিজের উদ্যোগে পাহাড় কেটে সমতল করে নিতে হয়। বিভিন্ন পাহাড় কেটে সমান করে ফেলা হয়েছে। ভেতরে ভেতরে করা হয়েছে বিভিন্ন সড়ক। বিভিন্ন প্লটের সামনে সাইনবোর্ড দিয়ে ব্যক্তির নাম, জায়গার বিএস খতিয়ান ও নামজারি খতিয়ান নম্বর লেখা আছে। তবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের সেসব খতিয়ানের একটিরও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব পাহাড় কাটা ও জমি বিক্রি হয়েছে যৌথ বাহিনীর অভিযানের আগে। ইয়াছিনের লোকজন এসব খতিয়ান নম্বর দিয়ে থাকে। নম্বরগুলো আসল নাকি নকল সেটি কেউ জানে না এবং যাচাইও করে না। দেড়-দুই লাখ থেকে শুরু করে ৩০ লাখ টাকায় প্লটের ‘দখল শর্ত’ কেনাবেচা হয় আলীনগরে। পরে সেটির ‘রেজিস্ট্রি’ নিতে হয় ইয়াসিনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকায়। সরকারিভাবে জায়গার নিবন্ধন নিতে যত তথ্যের প্রয়োজন হয়, এখানে তার কিছুই দরকার হয় না। ইয়াছিনের ‘মর্জিমাফিক’ সব দিতে হয়। তবে গত এক মাসে কোনো জমি কেনাবেচা হয়নি। যেসব প্লটের লোকজন এলাকায় বসবাস করেন, তাদের প্রতি মাসে ৫০ টাকা করে সমিতির তহবিলে জমা দিতে হয়। যেসব প্লটের দখলদার সেখানে অবস্থান করেন না, তাদের মাসে দিতে হয় ১০০ টাকা করে। এ ছাড়া সমিতিকে বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রতিটি আবাসিকে দিতে হয় প্রতি ইউনিটে ১২ টাকা ও ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ১৩ টাকা করে।

স্থানীয়রা জানান, সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকায় ৫টি ও আলীনগরের ৩টি বিদ্যুতের মিটার থেকে সাব-মিটার করে বিভিন্ন বসতঘর ও দোকানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়। আলীনগরের বাসিন্দারা ইয়াছিনের নিয়ন্ত্রণাধীন সমিতিতে এবং ছিন্নমূল এলাকার লোকজন ‘সমাজের’ সমিতিতে বিল পরিশোধ করেন। সে হিসেবে বিদ্যুৎ বিল বাবদ ছিন্নমূলের সমিতির নেতাদের ও আলীনগরের ইয়াছিনের পকেটে যায় মাসে কয়েক লাখ টাকা। এ ছাড়া এক দিন পর পর বিভিন্ন বসতঘরে পানি দেওয়া হয়। যাদের ঘরে এক হাজার লিটারের পানির ট্যাংক আছে, তাদের মাসিক পানির বিল দিতে হয় ১৫০০ টাকা; আর অন্যদের দিতে হয় ৮০০ টাকা করে। প্রতি মাসে তারা বিদ্যুৎ ও পানির বিল নিজেরাই গিয়ে সমিতিতে জমা দিয়ে আসেন।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার জিয়া উদ্দিন বলেন, আমরা কয়েকটি বৈঠকে বসেছি এবং সেখানে (সলিমপুর) রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য প্রস্তাব দিয়েছি। বিভিন্ন দপ্তর, যারা সেখানে জায়গা চেয়েছিল, তাদের বর্তমানে সে সক্ষমতা আছে কি না সেটা দেখার জন্য জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে ২৯ সদস্যের কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। তারা কাজ করছে এবং আমাদের একটা সুপারিশ দেবে। জেলা প্রশাসকের কমিটির সুপারিশ পেলেই সলিমপুরে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে। জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে পুলিশ এবং এপিবিএনের স্থায়ী ক্যাম্প করার কথা হবে। তাদের আবাসনের জন্যও আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। সেটা দ্রুত সময়ে হয়ে যাবে। আমি নিজেই মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছি বরাদ্দ ছাড় পাওয়ার জন্য।

র‌্যাব-৭ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ছিন্নমূল ও আলীনগর এলাকায় এখন কোনো সন্ত্রাসী নেই। সেখানে যৌথ বাহিনীর দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে এক লাখের মতো বাসিন্দা রয়েছে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব তো আমাদের। যার কারণে সেখান থেকে ক্যাম্প প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!