রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়েছে সরকার। তবে সেই ঘাটতি কমিয়ে আনতে দেশের শীর্ষ (বৃহৎ করদাতা) ১৬টি শিল্প গ্রুপকে সমন্বিতভাবে যৌথ নিরীক্ষা করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রাজস্ব ফাঁকি ঠেকানোসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে নিরিক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানটি।
এনবিআরের নতুন কাঠামোর অধীনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে ছয়টি বিশেষ নিরীক্ষা দল কাজ করবে। তারা নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, আয়কর রিটার্ন এবং ভ্যাট দাখিলপত্র পরীক্ষা করে দেখবে বলে জানা গেছে।
এদিকে, টানা রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়ায় উন্নয়ন অংশীদার প্রতিষ্ঠান আইএমএফ প্রতিশ্রুত ঋণের ষষ্ঠ কিস্তির ১৩০ কোটি ডলার এখনো ছাড় দেয়নি।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম হয়েছে। ৯ মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ৯৭ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। তবে এই সময়ে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। সে হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে ২৫ শতাংশের মতো। চলতি অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা।
প্রাথমিক পর্যায়ে সমন্বিতভাবে যৌথ নিরীক্ষার আওতায় রয়েছেÑ পিএইচপি ইন্টিগ্রেটেড স্টিল মিলস লিমিটেড, স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেড, বসুন্ধরা পেপার মিলস লিমিটেড, আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। পর্যায়ক্রমে মোট ১৬টি প্রধান শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছে এনবিআর।
নিরীক্ষার বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের ভ্যাট নিরীক্ষা ও আধুনিকীকরণবিষয়ক সদস্য মুশফিকুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এটা রাজস্বব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছতার দিকে নিয়ে যাবে। এটাকে পূর্বাভাস বলা যেতে পারে এবং ন্যায্যতার বিষয়ও এখানে জড়িত। তিনটি শর্ত সামনে রেখে নতুন পরিকল্পনা করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নতুন উদ্যোগের লক্ষ্য হলো রাজস্ব আদায় শক্তিশালী করা, জিডিপির প্রায় ৬ দশমিক ৬ শতাংশের কম কর-আয়ের অনুপাতের সমস্যার সমাধান, কর পরিপালন প্রক্রিয়া আরও উন্নতকরণ এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য ১৫ শতাংশ কর আয়ের লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি যাওয়া।
জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘উদ্যোগটি করব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার সমাধান দিতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে রাজস্ব বোর্ড। তবে বৃহৎ করদাতাদের লক্ষ্য করে সমন্বিত নিরীক্ষা পদ্ধতি একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ। সাধারণত সেখানে আয় কম দেখানো হয় এবং ভ্যাটসংক্রান্ত গরমিলের সিংহভাগ ঘটে থাকে। তাই এটি যৌক্তিক পদক্ষেপ।’
এদিকে, রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের উদ্যোগের অংশ হিসেবে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করেছে এনবিআর। তার পরও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে এনবিআর। আইএমএফ সম্প্রতি তাদের ষষ্ঠ কিস্তির ১৩০ কোটি ডলার ঋণের অর্থ ছাড় দেয়নি। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে রাজস্ব আদায়ে পিছিয়ে পড়া।
তবে বাংলাদেশে কর-জিডিপির অনুপাত ৭ শতাংশের কম (বর্তমান ৬ দশমিক ৬)। তাই আগামী ১০ বছরে তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে চায় সরকার। তবে এই রাজস্ব আদায়কে অনেকটা অসম্ভব বলে মনে করছেন এনবিআরের একাংশের কর্মকর্তারা।
তারা মনে করছেন, এনবিআর পৃথকীকরণ বিরোধী আন্দোলন ঘিরে এখনো স্বাচ্ছন্দ্য বা কর্মপরিবেশ ফেরেনি। অন্যদিকে সরকারের এই আদায় চাপকে নীতিবিরুদ্ধ হিসেবে দেখছেন তারা।
জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগামী তিন মাসের (এপ্রিল-জুন) মধ্যে চতুর্থ প্রান্তিকে যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করব। এটি হচ্ছে ইমিডিয়েট লক্ষ্য। দ্বিতীয় লক্ষ্য হচ্ছে, গত বছর যে পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে আমরা লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘কর জিডিপি হারÑ আমাদের ইশতেহারে যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা আছেÑ একসময় ১০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া হবে। তারপরে ২০৩৫ সালে ১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া হবে।’ তবে বৃদ্ধির নির্ধারিত কৌশল নিয়ে সন্দিহান এনবিআরের একাংশের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে শুল্ক-কর বাবদ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ৫১ কোটি টাকা। তবে সংগ্রহ হয়েছে ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। ফলে ফেব্রুয়ারি মাসের একক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ১১ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। অবশ্য গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় এ মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।
‘বর্তমান অর্থনীতি একটি অত্যন্ত নাজুক ও ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত’ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এই অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো এর কর-জিডিপি অনুপাত, যা বর্তমানে তলানিতে অর্থাৎ, ৭ শতাংশেরও কম’ বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
এদিকে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে ৯৭ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। এই সময়ে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা।
আদায় হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। এ হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে ২৫ শতাংশের মতো। চলতি অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা।
আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস অনুবিভাগের কোনোটিই তাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে পারেনি। কাস্টমস অনু বিভাগ ১ লাখ ৩ হাজার ১৯৬ কোটি টাকার বিপরীতে ৮০ হাজার ২২৩ টাকা, ভ্যাট ১ লাখ ৪৩ হাজার ৫৩৮ কোটির বিপরীতে ১ লাখ ৯ হাজার ১৩৮ কোটি এবং আয়কর অনু বিভাগ ১ লাখ ৩৯ হাজার ১১৮ কোটি টাকার বিপরীতে ৯৮ হাজার ৫০১ কোটি টাকা আদায় করেছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন