দ্রব্যমূল্যর চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষ। বাজারে কোনো পণ্যের দামই কমছে না। নাভিশ্বাস উঠছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের। রাজধানী থেকে জেলা, সবখানে একই চিত্র। বাজারে গিয়ে হতাশ ক্রেতারা। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ-মাংসসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের দামই উঁচুতে আটকে আছে। কোথাও সামান্য কমলেও তা স্থায়ী হচ্ছে না। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সংসার খরচে বাড়ছে চাপ, কমছে সঞ্চয়, থমকে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, ডলারের উচ্চমূল্য ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব পড়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকছে না।
সরকার বলছে, দাম নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, চাল, ডাল, তেল, মাছ-মাংস ও সবজির বাড়তি দামের চাপে পিষ্ট নিম্ন আয়ের মানুষ। প্রশ্ন উঠছে, সরকারি দাবি ও বাস্তব বাজারদরে এত ফারাক কেন? পাইকারি ও খুচরা বাজারে এত ব্যবধান তৈরি হচ্ছে কোথায়? এর ভার বহন করছে কারা? হাসিমুখে বাজারে গিয়ে ক্রেতাদের কেন থলেভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ফিরতে হচ্ছে?
সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমতির দিকে বলা হচ্ছে। বাজার তদারকি জোরদার, আমদানি শুল্ক সমন্বয়, সরবরাহ বাড়ানো- এসব উদ্যোগের কথাও জানানো হচ্ছে নিয়মিত। কিন্তু রাজধানী থেকে জেলা শহর, হাটবাজার থেকে পাড়া-মহল্লা, নিত্যপণ্যের বাজার থেকে মিলছে ভিন্ন বার্তা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাইকারি ও খুচরা বাজারে মূল্যের ব্যবধান এখন অস্বাভাবিক বেশি। সরবরাহ শৃঙ্খলের একাধিক স্তর, অস্বচ্ছ লেনদেন, সিন্ডিকেটের অভিযোগ এবং পরিবহন ব্যয়- সব মিলিয়ে এই ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমেছে, ফলে দেশীয় বাজারেও চাপ কমার কথা। বিশেষ করে ভোজ্যতেল, গম ও কিছু ডালের আমদানি ব্যয় আগের চেয়ে সহনীয় হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী কিংবা চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ থেকে খবর নিয়ে জানা গেছে, খুচরা পর্যায়ে সেই স্বস্তির প্রতিফলন খুব একটা নেই। মাঝারি মানের চালের কেজি ৬০-৭০ টাকার নিচে নামছে না। মসুর ডাল ১০০ টাকার ওপরে। সয়াবিন তেলের দামও মগডালে। আর মৌসুমি সবজিতেও ওঠানামা প্রবল।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে গতকাল বুধবার সকালে কথা হয় রিকশাচালক আবু কালামের সঙ্গে। তিনি বলেন, আগে ১ হাজার টাকায় সপ্তাহের বাজার হয়ে যেত। এখন ২ হাজারেও টান পড়ে। চাল-ডাল কিনতেই টাকা শেষ। কারওয়ান বাজারে পাইকারি বিক্রি হওয়ায় দাম কিছুটা কম বলে তিনি এখানে এসেছেন। তবে সামান্য কম হলেও এখানে যে দাম, সেটাও তার সাধ্যের বাইরে।
এই বাজারে কথা হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী আফরোজা পারভিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাচ্চার দুধ, ডিম, তেল সবকিছুরই দাম বেশি। গরুর মাংসের কেজি সেই যে ৮০০ টাকায় ঝুলে আছে, সেটা আর নামছে না। মাসের ২০ তারিখ পার হতেই ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়। এভাবে আর কত দিন? টেলিভিশন আর পত্রিকায় দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলে পণ্যের দাম অনেক কম; কিন্তু ঢাকায় আসার পর এভাবে তিন-চারগুণ হয়ে যায় কীভাবে? আসলে সরকার এই সিন্ডিকেট থেকে বের হতে পারছে না।
কারওয়ান বাজারের তেল ব্যবসায়ী আরমান আলী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, পাইকারি পর্যায়ে কিছু পণ্যের দাম কমলেও খুচরা বাজারে তা পৌঁছাচ্ছে না। সরবরাহ চেইনের বিভিন্ন স্তরে অতিরিক্ত মুনাফা, পরিবহন ব্যয় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব- সব মিলিয়ে ভোক্তা পর্যায়ে দাম কমছে না। এই মূল্যবৃদ্ধি বা থমকে থাকার অন্যতম কারণ মনিটরিংয়ের অভাব। দেশে সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু অসৎ মুনাফাখোর সিন্ডিকেটের কোনো পরিবর্তন হয় না। মানুষের পরিবর্তন হলেও চরিত্রের কোনো পরিবর্তন নেই। সব সরকারই কেন যে এই অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না- সেটাই বোধগম্য নয়। অথচ সাধারণ বিক্রেতা হিসেবে সরাসরি ক্রেতার মুখোমুখি হতে হয় তাদের, গালমন্দ শুনতে হয় এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতও তাদের ওপর অভিযান চালান। আসল জায়গায় কেউই হাত দিচ্ছে না বলে ক্ষোভ ঝারলেন আরমান আলী।
মিরপুরের এক গার্মেন্টসকর্মী বলেন, ‘গরুর মাংস তিন মাসে একবার খাই। ডিমও হিসাব করে গুনে গুনে কিনতে হয়। এক ডিম দুজন ভাগ করে খেতে হয়। বাচ্চাদের চাহিদা মেটাতে পারি না।’
ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি বিপাকে দিনমজুর, শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষ। কাজ না থাকলে আয় নেই, অথচ বাজারে দাম একই রকম। ফলে অনেক পরিবারে কমছে খাবারের পরিমাণ ও মান। পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিও বাড়ছে।
বাজারদর কেন থমকে আছে? কেন বাড়ছে? অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের নিত্যপণ্যের একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর। ডলারের উচ্চমূল্য ও আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের বাজারে। এছাড়া জ¦ালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে। এটাই দাম বাড়ার প্রধান কারণ। আর নজরদারির অভাব তো বহু আগে থেকেই রয়েছে। রাষ্ট্র বা সরকারের কঠোর অবস্থান ও সদিচ্ছা ছাড়া এখান থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহেদ আলভী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, মূল্যস্ফীতি শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা। আয় না বাড়লে শুধু বাজার মনিটরিং দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সরকারকে সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরাসরি সহায়তা কর্মসূচি বাড়ানো জরুরি। নইলে দীর্ঘমেয়াদি এই চাপ সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। মনে রাখতে হবে, যখন আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বেড়ে যায়, তখন মানুষের মানসিক চাপও বাড়ে।
তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানি ব্যবস্থাপনা, মজুতদারি রোধ এবং আয় বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় বাজারে স্বস্তি ফিরবে না। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা বাজার মনিটরিং জোরদারের কথা বলছে। টিসিবির মাধ্যমে কম দামে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। তবে তা সবার জন্য পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেন ড. জাহেদ।
ব্যবসায়ী নেতা হেলাল উদ্দিন গতকাল রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ডলারের সংকট ও আমদানি ব্যয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিত্যপণ্যের বাজারে। ভোজ্যতেল, ডাল, গম, চিনিসহ বহু পণ্যই আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার ও ডলারের দামের ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলছে খুচরা বাজারে।
সরকার মূল্যস্ফীতি কমাতে কড়াকড়ি মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। সুদের হার বাড়ানো, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব আদায়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে- এই পদক্ষেপগুলো কি যথেষ্ট? এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, স্বল্প মেয়াদে কঠোর নীতি দরকার। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলাবে না। ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ও রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার সবার আগে অত্যন্ত জরুরি। ডলারের সংকট, রিজার্ভ চাপ ও মূল্যস্ফীতিÑ সবকিছুর পেছনে রয়েছে কাঠামোগত দুর্বলতা। আর এর প্রভাবই পড়ছে দ্রব্যমূল্যে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. কে এ এস মুরশিদ বলেন, বাজারব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা বেশি। কৃষক বা আমদানিকারক যে দামে পণ্য ছাড়ছেন, খুচরা বাজারে তার সঙ্গে বহুস্তরের মার্জিন যোগ হচ্ছে। পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা না থাকলে এই ব্যবধান কমে না। তিনি আরও বলেন, বাজার তদারকি শুধু অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে সুফল আসে না। সবার আগে প্রয়োজন সরবরাহব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, আমদানিনির্ভরতা কমানো না গেলে বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করা এবং বিকল্প উৎস খোঁজা জরুরি।
সাধারণ ব্যবসায়ীদের মতে, রেমিট্যান্সের উল্লম্ফন আপাতদৃষ্টিতে আশার সঞ্চার করলেও ডলারের বাজারে অস্থিরতা, আমদানি ব্যয়ের চাপ ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি অর্থনীতিকে এক কঠিন সমীকরণের মুখে দাঁড় করিয়েছে। নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, স্বল্পমেয়াদি স্বস্তির বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথ তৈরি করা। কারণ শেষ পর্যন্ত এই সমীকরণের ভার বহন করছে সাধারণ মানুষ, যার আয়ের চেয়ে ব্যয়ের গ্রাফ দ্রুত উপরের দিকে উঠছে। আর দোষ এসে পড়ছে সাধারণ ব্যবসায়ীদের ওপর।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তিনটি বিষয় একে অপরকে প্রভাবিত করছে। ডলারের সংকটের কারণে বাড়ছে আমদানি ব্যয়। আবার আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে মূল্যস্ফীতি আর এই মূল্যস্ফীতির কারণে বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সামাজিক চাপ। আবার সামাজিক চাপ দেখা দিলেই বেড়ে যায় রিজার্ভে চাপ। দেখা দেয় বিনিময় হারে অস্থিরতা এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, তথ্যপ্রবাহ স্বচ্ছ করা এবং ডিজিটাল নজরদারি জোরদার না করলে স্থায়ী সমাধান মিলবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। সেগুলো হচ্ছেÑ সরবরাহ শৃঙ্খল আধুনিকীকরণ ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং, কৃষি উৎপাদন ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, আমদানি উৎস বৈচিত্র্যময়করণ, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং বাজারের তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা আনা।
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ প্রসঙ্গে বলেন, শুধু ডলারের বাজার স্থিতিশীল হলেই দাম কমবেÑ এমন ধারণা ঠিক নয়। মুদ্রানীতির পাশাপাশি বাজার তদারকি ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি। এই চক্র ভাঙতে হলে সমন্বিত নীতি প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
তার মতে, সংস্কার ছাড়া স্বস্তি সাময়িক হবে। রাজনৈতিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক আস্থার জন্য অপরিহার্য। স্বল্পমেয়াদি শুল্ক কমানো বা ভর্তুকি দিয়ে সাময়িক স্বস্তি দেওয়া যায়, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও মনে করেন, পাইকারি বাজারে দাম কমার ইঙ্গিত থাকলেও খুচরায় তা দ্রুত প্রতিফলিত হয় না। তথ্যের অস্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি এই বিলম্বের অন্যতম কারণ।
সরকার, অর্থনীতিবিদ আর বিশ্লেষকেরা যা-ই বলুন না কেন, সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই- কবে কমবে দাম? যত দিন সেই প্রশ্নের উত্তর না মিলছে, তত দিন বাজারের ব্যাগ হাতে মানুষের দীর্ঘশ্বাসই হয়ে থাকবে বাস্তবতার সবচেয়ে বড় শিরোনাম।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন