ঝালকাঠির চাচৈড় হবিকাঠি এলাকার তাসনিম জাহান মিম (২৩), বরিশাল সদর উপজেলার রায়পাশা-কড়াপুর এলাকার হাফিজা আক্তার, কামদেবপুর এলাকার সুমি আক্তার (১৯), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার চৈতা গ্রামের লাবণী আক্তার নাজমা (২৮) ও ছাবিনা (৩০), বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই এলাকার মো. রুবেল (২২) এবং নগরীর কাশিপুর এলাকার আয়শা সিদ্দিকা (৩০)। ২০ থেকে ৩০-এর কোটায় বয়স সবার। এই বয়সে তাদের কলেজের বারান্দায় বন্ধুদের নিয়ে আড্ডায় মেতে থাকার কথা। অথবা চাকরি বা ব্যবসা করে পরিবারের ব্যয়ভার বহন করার সময়। কিন্তু এই সময়ে তারা মেতেছেন এক নেশায়। এটা মাদকের নেশার চাইতেও যেন বড় একটা নেশা। যে নেশার বলি হচ্ছেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগীরা। এই নেশা বা পেশার নাম দালালি। বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গতকাল মঙ্গলবার দালালি পেশায় নিয়োজিত এই তরুণ-তরুণীদের আটক করে বিভিন্ন মেয়াদের দণ্ড দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শুধু এই হাসপাতাল নয়, রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ দেশের এমন কোনো সরকারি হাসপাতাল নেই যেখানে এসব দালালের দৌরাত্ম্য নেই। অনেক হাসপাতালে কর্তৃপক্ষ নিজেই অসহায় থাকে এসব দালালের কাছে। ফলে দিনের পর দিন ভোগান্তি পোহাতে হয় সাধারণ রোগীদের। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা সরকারের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কারো কোনো হুঁশিয়ারিই কাজে দেয় না এসব দালাল নিয়ন্ত্রণে। তাই সুপরিকল্পিতভাবে প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি বিশেষজ্ঞদের।
রাজধানী ঢাকার দক্ষিণ-পূর্ব এলাকার বাসিন্দাদের রোগে-শোকে ভরসার নাম মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ৫শ শয্যার হাসপাতালটিতে পাওয়া যায় প্রায় সব ধরনের রোগের চিকিৎসাসেবা। করোনার সময় থেকেই হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবার ওপর মানুষের আস্থা বেড়ে যায়। পরবর্তীতে ডেঙ্গু রোগীদেরও ভরসাস্থল হয়ে ওঠে এটি। কিন্তু ভোর ৬টা থেকেই হাসপাতাল আঙ্গিনায় রোগীদের পাশাপাশি গিজগিজ করতে থাকে দালালরা। হাসপাতাল থেকে বেসরকারি কোনো ডায়াগনস্টিকে রোগী ভাগিয়ে নিতে তাদের তৎপরতা অনেক চেষ্টা করেও থামাতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের শয্যা পাওয়া থেকে শুরু করে বহির্বিভাগে ডাক্তার দেখানো পর্যন্ত রোগীদের পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ।
সরেজমিনে হাসপাতালটিতে দেখা যায়, জরুরি বিভাগে রক্ত দিতে এসেছেন এক যুবক। এক দালাল তাকে টাকার বিনিময়ে রক্ত দিতে নিয়ে এসেছেন জানিয়ে ওই যুবক বলেন, আমি একটি ফার্মেসিতে চাকরি করি। এখানে রক্ত দিতে এসেছি। ঠিক তখনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তাকে আটক করতে দেখা যায়। কেন তাকে আটক করেছেন জানতে চাইলে এক পুলিশ সদস্য জানান, সে এখানে আসা রোগীদের জিম্মি করে রক্তের বাণিজ্য করে। টাকার বিনিময়ে রক্তদাতা এনে দেয়।
শুধু এই যুবক নয়, সুমাইয়া আক্তার, আজাদ শেখ, আজিজুর মুন্সি, আবুল বাসার, আশিক আহম্মেদ, ইলিয়াস, ওহিদুজ্জামান, জীবন ইসলাম, তরিকুল ইসলাম, মোসা. ফারজানাসহ একাধিক দালালচক্র এখানে সক্রিয় থাকে ২৪ ঘণ্টা জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক চিকিৎসক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সরকার আসে সরকার যায়। কিন্তু এসব দালালচক্র দমনে কেউই সফল হয় না। অভিযান হয় মাঝে মাঝে। তখন হম্বিতম্বি করে কয়েকজনকে আটক করা হয়। আবার কয়েকদিনের মাথায়ই তারা ছাড়া পেয়ে একই কাজে নিযুক্ত হয়ে পড়ে। তারা হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়া, রোগীদের প্রভাবিত করে বিনা মূল্যের ওষুধ না কিনে পাশের ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে বাধ্য করে। কেউ আবার হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করিয়ে অন্য বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য রোগীদের নিয়ে যায়।
তবে বিভিন্ন হাসপাতালে দালাল চক্র নিয়মিত অভিযান চালানোর কথা বলেন ডিএমপির স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মহিদুর রহমান। তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, মুগদা হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি হাসপাতালে নিয়মিত আমরা অভিযান চালাই। এখানে আইনের কিছুটা সীমাবদ্ধতা থাকায় খুব সামান্য সাজা হয় তাদের। ফলে কয়েকদিনের মাথায় আবারও একই কাজে নিয়োজিত হয়ে পড়েন তারা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রিপন নামের এক দালাল বলেন, তার বাড়ি পাশের একটি বস্তিতে। কোনো কাজ করেন না। তাই তিনি হাসপাতালে এসে রোগীদের সেবা পাইয়ে দিতে আয় করার পথ বেছে নিয়েছেন। তার বিবরণ থেকে জানা যায়, অনেক রোগী ঢাকার বাইরে থেকে আসেন, তারা হাসপাতালের কোন ভবনে কী, কোথায় কী করতে হবে। ভর্তির প্রক্রিয়া, ল্যাবে পরীক্ষার কাজ করতে পারেন না। অথবা চিকিৎসকের রুমেও বিড়ম্বনায় পড়েন। কিন্তু তিনি কাজটি স্বাভাবিকভাবে করে দিয়ে কিছু টাকা নেন। এর মাধ্যমে তার সংসার চলে। আর হাসপাতালের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন তিনি। ফলে রোগীর চিকিৎসাসেবায় হয়রানি কম হয় বলে এই দালালের দাবি।
এ সময় এক রোগীর চিকিৎসাসেবার প্রক্রিয়ার খোঁজ করে দেখা যায়, তার ভর্তি ও পরীক্ষার দায়িত্ব নেন হাসপাতালের একজন কর্মচারী। বিনিময়ে তাকে দিতে হয় ৪০০ টাকা। ফলে এক্স-রে করাতে গিয়ে তাকে কোনো লাইনে দাঁড়াতে হয়নি। সিরিয়ালে ন্যূনতম ২০ জন রোগী থাকলেও এই রোগীকে নিয়ে দালাল সরাসরি এক্স-রে রুমে চলে যান। সেখানে সব প্রক্রিয়া শেষ করে দেন। অবশ্য এজন্য এক্স-রে রুমের সংশ্লিষ্টদের আরও ১০০ টাকা দিতে হয়। এভাবে দালালদের মাধ্যমে যেসব রোগী ভেতরে আসে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছেন তারা।
শুধু তাই নয়, হাসপাতালের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকার সুযোগটি নিচ্ছে আশপাশের বেসরকারি ক্লিনিক হাসপাতালগুলো। বিভিন্ন ক্লিনিকের দালালরা ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসারত রোগীদের টেস্টের স্যাম্পল সংগ্রহে এক ধরনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। অবিশ^াস্য হলেও সত্য, শুধু ঢামেক হাসপাতালেই বিভিন্ন ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিকের দেড় শতাধিক দালাল সকাল-সন্ধ্যা অফিস ডিউটির মতোই উপস্থিত থাকে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এমনই একটি বেসরকারি হাসপাতালের প্রতিনিধি উজ্জ্বলের (ছদ্মনাম) কাছে রোগীপ্রতি কত টাকা কমিশন পান জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই হিসাবটা একটি জটিল। যদি কোনো অপারেশনের রোগী হয় তা হলে মোট খরচের ১০ ভাগ পাই। আর যদি কোনো অপারেশন নয়, বরং শুধু চিকিৎসা নেবে সেক্ষেত্রে ৫ ভাগ টাকা দেয়। অসহায় গরিব রোগীদের এরকম ঠকাতে খারাপ লাগে না- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দেখেন আমি যেই কাজ করি এটা দিয়ে তিনটা পরিবারের উপকার হয়। এক নম্বরে যার উপকার হয় সে হচ্ছে রোগী। ঢাকা মেডিকেলের যে পরিবেশ আর রোগীর চাপ। একটা অপারেশন করাতে মাসের পর মাস হাসপাতালে কাটাতে হয়। আর বেসরকারি হাসপাতালে সকালে ভর্তি করালে বিকেলে অপারেশন। রোগীর তো আর বাড়তি কোনো খরচ নেই। এতে করে রোগীর উপকার হচ্ছে তেমনি করে কমিশনের টাকা দিয়ে আমার সংসারের খরচও জোগাড় হচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোরও উপকার হচ্ছে। এতে কোনো ভুল দেখছি না কারও।
তবে অভিযোগ পাওয়া যায়, এসব দাললকে মদদ দিচ্ছে খোদ হাসপাতালেরই কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মচারী ও নিরাপত্তারক্ষী। তাদের সহযোগিতায় ক্লিনিকের দালালরা তাদের অপতৎপরতা অব্যাহত রাখার সুযোগ পায়। চিকিৎসকদের কেউ কেউ এ অপতৎপরতার সঙ্গে যুক্ত।
এদিকে এসব বেসরকারি হাসপাতালের আবার বেশির ভাগেরই নেই অনুমোদন। হাসপাতালপাড়া বলে পরিচিত এক শ্যামলী এলাকায়ই সরকারি বেশ কিছু হাসপাতালের পাশাপাশি রয়েছে শতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল। এদের মধ্যে আবার অনেকেরই নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন। কিন্তু এসব হাসপাতালেই শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল), জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটট ও হাসপাতালসহ অন্য সরকারি হাসপাতালগুলো থেকে রোগী বাগিয়ে আনে এই দালালরা- এমন অভিযোগ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের এক কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এই এলাকায় রয়েছে ১০ থেকে ১৫টি সরকারি হাসপাতাল। এই হাসপাতালগুলোকে কেন্দ্র করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে থেকে শুরু করে শ্যামলী স্কয়ার পর্যন্ত আধা কিলোমিটার রাস্তায় গড়ে উঠেছে শতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল। এসবের বেশির ভাগেরই নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন। সরকারি হাসপাতালগুলো থেকে দালালের মাধ্যমে রোগী ভাগিয়ে এনে ফায়দা লাভ করাই এসব হাসপাতালের মূল কাজ।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাবর রোড, খিলজি রোড, টিবি হাসপাতাল রোড ঘিরে এসব হাসপাতালের রমরমা ব্যবসা চলছে। আধা কিলোমিটার রাস্তায় বেবি কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক, ট্রমা সেন্টার অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক, অ্যানালাইসিস ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল, আশিক মাল্টি স্পেশালাইজড, সিগমা মেডিকেল, মনমিতা মানসিক হাসপাতাল, শেফা হাসপাতাল, লাইফ কেয়ার নার্সিং হোম, এলিট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক, চেস্ট কেয়ার, শিশু নিরাময়, মক্কা মদিনা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক, প্লাজমা মেডিকেল সার্ভিস অ্যান্ড ক্লিনিক, আল মারকাজুল ইসলামী হাসপাতাল, নিউ ওয়েল কেয়ার হাসপাতাল, জয়ীতা মেডি ল্যাব, জনসেবা নার্সিং হোম, মুন ডায়াগনস্টিকসহ অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে শ’ শ’ রোগী আর দালালে গিজগিজ করে পুরো এলাকা। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স, শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং জাতীয় বাতজ্বর ও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রসহ এই এলাকায় সরকারি হাসপাতালগুলো ঘিরে দালালদের দৌরাত্ম্যের কথা স্বীকার করেছে খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও।
তবে বর্তমান সরকার এসব দালাল নিয়ন্ত্রণে বদ্ধপরিকর জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। তবে আমরা হাসপাতালগুলোতে দালালদের দৌরাত্ম্য প্রতিরোধে সর্বোচ্চ তৎপর। সম্প্রতি ডিসি সম্মেলনে স্পষ্ট করে ডিসিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওষুধের দোকানে ভেজাল ওষুধ বিক্রি বন্ধ, হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে। শুধু তাই নয় অসহায় মানুষের জীবন নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলছেন তাদের শাস্তির বিষয়টিও আরও বাড়ানো যায় কি না তা ভাবা হচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন