দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি। বিএনপি হাইকমান্ড মনে করছে, যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলে সাংগঠন চাঙ্গা ও দায়িত্ব বণ্টন সহজ হবে এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে কাজের স্পৃহা বাড়বে। পাশাপাশি সাংগঠনিক বিভিন্ন অপরাধও কমে আসবে, যে কারণে খুব কম সময়ের মধ্যে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, আগামী কিছুদিনের মধ্যেই ঢাকা যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে আংশিক বা আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে পরিচালিত হয়ে সংগঠনটি। এতে নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা হতাশা কাজ করছে। সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনায় এবারের কমিটিতে ত্যাগী, পরিশ্রমী এবং রাজপথের লড়াইয়ে পরীক্ষিত নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। গত আন্দোলনে যারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং কারাবরণ করেছেন, তাদের মূল্যায়ন করা হবে বলে জানা গেছে। যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ইতোমধ্যে পদপ্রত্যাশীদের জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করেছেন। পাশাপাশি নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে সংগঠনকে আরও চাঙ্গা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এখানে নবীন ও প্রবীণের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি করার চেষ্টা চলছে।
পদপ্রত্যাশী নেতারা বিএনপি হাইকমান্ডসহ নীতিনির্ধারকদের কাছে দৌড়াচ্ছে : সূত্র মতে, বিএনপি দলটির বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনে স্থবিরতা কাটাতে এবার নড়েচড়ে বসেছে। সংগঠনগুলো পুনর্গঠনে ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছেন চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই খবরে নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙ্গাভাব তৈরি হয়েছে এবং পদ-পদবির জন্য তাদের তৎপরতাও বেড়েছে। বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের পদপ্রত্যাশীদের ব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়েছে। অনেকেই বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের ভূমিকার কথা নানাভাবে বিএনপি হাইকমান্ডসহ নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
২২ মাস পার হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি সম্ভব হয়নি : ২০২৪ সালে আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী যুবদলের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই কমিটির মেয়াদ ইতোমধ্যে প্রায় ২২ মাস পার হলেও তা পূর্ণাঙ্গ করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
১৫১ সদস্যের কমিটি অনুমোদনের জন্য জমা : যুবদল নেতারা বলছেন, অনুকূল পরিবেশে আংশিক কমিটি দীর্ঘদিনেও পূর্ণাঙ্গ না করার কারণে বর্তমান কমিটির ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে। কয়েক মাস আগে ১৫১ সদস্যের কমিটি অনুমোদনের জন্য হাইকমান্ডের কাছে জমা দিলেও সেটিকে ‘মাইম্যান’ কমিটি হিসাবে উল্লেখ করছেন কেউ কেউ। এরই মধ্যে যুবদলের নতুন কমিটি দেওয়ার আলোচনা শুরু হয়েছে। নতুন কমিটির শীর্ষ দুই পদে আসার আলোচনায় বর্তমান কমিটির দুই নেতা তো আছেনই, সঙ্গে আছেন সংগঠনটির সাবেক-বর্তমান অনেক নেতা।
কেন্দ্রীয় কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় যারা : সূত্র মতে, যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন শরীফ উদ্দিন জুয়েল। জুয়েল বাংলাদেশের একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক। তিনি দায়িত্বশীলভাবে যুবদলের ঢাকা উত্তর শাখার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জুয়েলের নেতৃত্বে ঢাকা উত্তর যুবদল ব্যাপক শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল। শুধু উত্তর নয়, সারা দেশে জুয়েলের নাম রয়েছে, যুবদলের নেতাকর্মীরা এই পদে জুয়েলকেই চাইছেন। এ ছাড়া এই পদে বহুল আলোচনায় রয়েছেন, যুবদল ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্য সচিব (সাধারণ সম্পাদক) রবিউল ইসলাম নয়ন। নয়নকে মনেপ্রাণে সারা দেশের যুবদলের নেতাকর্মীরা বেশ পছন্দ করেন এবং তিনি শেখ হাসিনা সরকারের আতঙ্ক ও ‘কট্টরপন্থি’ জামায়াতবিরোধী। অন্যদিকে নয়ন সারা দেশে আলোচনায় আসার কারণ হলো ২০১৬ সালে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পুলিশ তার শরীরে গুলি করেছিল এবং তখন তাকে মৃত ভেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফেলে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরায় তিনি রাজনীতি ও কর্মীদের মাঝে ব্যাপকভাবে আলোচিত হন। তিনি বিগত দিনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকার পতনের অন্যতম হাতিয়ার ছিলেন। যে কারণে বিএনপির চেয়ারম্যানের সবুজ সংকেত ও গুড বুকে রয়েছেন এই যুবনেতা।
অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ। শ্রাবণের নাম স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি পদেও আলোচনায় আছে।
এ ছাড়া এই পদে আরও আলোচনায় রয়েছেন এস এম মিজানুর রহমান রাজ। রাজ ছাত্রদল ও যুবদলের একজন সুপরিচিত সক্রিয় রাজনৈতিক নেতা। তিনি মূলত ঢাকা মহানগর উত্তরকেন্দ্রিক রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন তিনি যুবকদের মনের মধ্যে বিরাজ করেন। তিনি যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। বর্তমানে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের নতুন কমিটিতে তার নাম শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছে।
এ ছাড়া গোলাম মাওলা শাহীনকে অনেকেই যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দেখতে চান। শাহীন যুবদলের একজন প্রভাবশালী নেতা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা মহানগরের যুব রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। সম্প্রতি তাকে ঘিরে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদের আলোচনা চলছে। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি হিসেবেও অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শাহীন কেন্দ্রীয় যুবদলের ১নং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। রাজনৈতিক সক্রিয়তা ও রাজপথে তিনি অন্যতম অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেন। বিগত সময়ে তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করতে হয়েছে।
অন্যদিকে এই পদে আলোচনায় রয়েছেন, সাজ্জাদুল মিরাজ। তিনি যুবদল, ঢাকা মহানগর উত্তরের বর্তমান সদস্য সচিব। মিরাজ একজন সক্রিয় সংগঠক ও রাজপথের পরিচিত মুখ।
তালিকায় আরও আছেনÑ যুবদল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক খন্দকার এনামূল হক এনাম, সাবেক ছাত্রনেতা ফজলুর রহমান খোকন, ইকবাল হোসেন শ্যামল, বিল্লাল হোসেন তারেক। এ ছাড়া ছাত্রদলের বর্তমান ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের নামও শোনা যাচ্ছে। জানতে চাইলে যুবদল (কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী) গোলাম মাওলা শাহীন জানান, ‘বিগত দিনে দলের পেছনে যে সময় দিয়েছি, দল সেখান থেকে সবকিছু বিবেচনা করে আমার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে এসব ব্যাপার আমি দলের হাইকমান্ডের ওপর ছেড়ে দিয়েছি।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য রূপালী বাংলাদেশকে জানান, ঈদের পরে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি হবে। এরপর দল পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বিএনপির কাউন্সিল হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন