× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: মে ১৯, ২০২৬, ০৫:৩৯ এএম

দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে হামে মৃত্যুর তালিকা

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: মে ১৯, ২০২৬, ০৫:৩৯ এএম

দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে  হামে মৃত্যুর তালিকা

বাঁজা, অলক্ষ¥ী, মুখ দেখে ঘর থেকে বের হলে খারাপ কিছু ঘটে, কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিলে সেখানেও কোনো অঘটন ঘটার আশঙ্কা থাকে এমন হাজারো কথা-অপকথা শুনতে হয়েছে রুকসানা আক্তারকে (ছদ্মনাম)। এর কারণ বিয়ের ৭ বছর পার হলেও কোনো সন্তান না হওয়া। এতসব কিছু হজম করেও আশায় বুক বেঁধে ছিলেন রুকসানা। অবশেষে ১৭ মাস আগে পান বহু কাক্সিক্ষত সেই সুখবর। গর্ভে সন্তানের ভ্রƒণ জন্ম নিয়েছে। বাঁধভাঙা খুশি রুকসানার পরিবারে। ১০ মাস পর গত বছরের অক্টোবরে জন্ম নেয় ফুটফুটে এক ছেলে সন্তানের। ঘোচে রুকসানার এতদিনের বাঁজা অপবাদের। কিন্তু মাত্র ৭ মাসের ব্যবধানে এই সুখ পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে। হামে আক্রান্ত হয়ে করুণ মৃত্যু হয় নাহিয়ানের। ভেঙে যায় রুকসানার সুখের সা¤্রাজ্য।

শুধু রুকসানা নন, এমনভাবে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত এবং হামের উপসর্গে গত ১৫ মার্চ থেকে গত রোববার পর্যন্ত মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে সারা দেশে ৪৫৯ শিশুর মৃত্যু হওয়া সব মায়েদের সুখের সা¤্রাজ্যই এভাবে ভেঙেচুরে শেষ হয়ে গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি এ সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৪৯৪ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ পাওয়া গেছে। সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ৭৫ শিশুর। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩৮৪ শিশু। একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে (পরীক্ষায় প্রমাণিত) ৭ হাজার ৭৬৭ জন। আর হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৫৭ হাজার ৮৪৬ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগের হাম ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ২০০ জন ও আক্রান্ত ৩১ হাজার ৫৬৫ জন।

কিন্তু এত মৃত্যু এবং আক্রান্তের দায় যাদের ওপর বর্তাচ্ছে সেই অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম মুখে কুলুপ এঁটেছেন, মুখ বন্ধ করেছেন ওই মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) হম্বিতম্বি করা অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমানও। নূরজাহান বেগম উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও মূলত মন্ত্রণালয়ের বেশির ভাগ কাজই হতো এই সায়েদুর রহমানের ইশারায়। এনজিও বিশেষজ্ঞ নূরজাহান বেগম স্বাস্থ্য বিভাগ সম্পর্কে বিশেষ অবগত না থাকলেও ডা. সায়েদুর রহমান এ বিষয়ে ছিলেন দক্ষ। কারণ এর আগে তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় (তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়) ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান এমনকি উপাচার্যের দায়িত্বও পালন করেছেন। স্বাস্থ্যের পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ উপদেষ্টার সহকারী হওয়ায় তার দম্ভে সেই সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পা রাখাই দায় ছিল সাংবাদিকদের জন্য। সম্প্রতি হাম ইস্যুতে সাবেক উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের পাশাপাশি এই বিশেষজ্ঞদের দায়ী করছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষজন। কিন্তু কোনোভাবেই সংবাদমাধ্যমে কথা বলতে নারাজ এই বিশেষজ্ঞ। মুখ না দেখানোর পাশাপাশি সাংবাদিক দেখে ঘরের দরজায়ও দিয়েছেন খিল।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ উচ্চ টিকাদানের হার নিয়ে গর্ব করে এসেছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৭ কোটি ৫০ লাখের বেশি মানুষের এই দেশে এই মহামারির মূল কারণ হলো ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থায় এক বিপর্যয়কর অবনতি। এর ফলে দেশব্যাপী টিকার সংকট দেখা দেয় এবং টিকাদানের হার নাটকীয়ভাবে কমে যায়। রোগটি ছড়িয়ে পড়ার পর শিশুদের উচ্চ অপুষ্টি এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা মৃত্যুর সংখ্যাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মত তাদের।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের দেশে সাধারণত শিশুদের ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার দুটি ডোজ দেয়। এ ছাড়া প্রতি চার বছর অন্তর দেশব্যাপী বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানো হয়, যাতে কোনো শিশু বাদ না পড়ে এবং ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত করা যায়। হামের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে এটা জরুরি। বছরের পর বছর ইউনিসেফ এই টিকা সরবরাহ করে আসছিল, যার বেশির ভাগ অর্থায়ন করত ‘গ্যাভি’। সরকারও এতে অবদান রাখত। কিন্তু ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এই ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয়। তিনি বলেন, আমরা যতদূর জানি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনূস সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা বন্ধ করে দেয় এবং উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে চলে যায়। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউনিসেফের এ সম্পর্কিত একটি সতর্কবার্তার চিঠি ছড়িয়ে পড়েছে; যা তারা তৎকালীন সরকারকে সতর্ক করে লিখেছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেটি গায়ে মাখায়নি। এক্ষেত্রে সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে অনেকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন। কিন্তু আমি মনে করি সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন খাত থেকে এসে স্বাস্থ্যের বিষয়গুলোর তার না বোঝারই কথা। কিন্তু ডা. সায়েদুর রহমান তো এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি কেন এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নিলেন? কার প্ররোচনায় আজ দেশের একটা প্রজন্মকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিলেন।

এ প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে ডা. সায়েদুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করে না পেয়ে রাজধানীর একটি অভিজাত এলাকায় তার বাসভবনে গিয়ে দেখা করতে গেলে বাড়ির বাইরে থেকেই ফেরত আসতে হয় এই প্রতিবেদককে। এক প্রতিনিধির মাধ্যমে খবর পাঠান এ বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য নেই। দেশে যখন শত শত নিষ্পাপ প্রাণ মারা যাচ্ছে তখন যাদের ওপর অভিযোগের তির, তাদের কারো পক্ষে কোনো বক্তব্য না পাওয়ায় অভিযোগ আরও তীব্র হচ্ছে দাবি করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, একটা সময় বাংলাদেশ ভ্যাকসিন হিরো হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। সেই জায়গায় আজ টিকা না পাওয়ায় প্রাণ যাচ্ছে হাজারো নিষ্পাপ শিশুর; যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এক্ষেত্রে যদি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের দায়ভার নাও থাকে তা হলেও তাদের উচিত তা জনসম্মুখে বলা আর যদি দায় থাকে তা হলে অবশ্যই ক্ষমা চাওয়া উচিত।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের স্বাস্থ্য খাত ছিল নানা সংকট, চাপ ও প্রত্যাশার মধ্যে। এই সময় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন নূরজাহান বেগম ও অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তাদের বিভিন্ন কর্মকা-, সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ ও প্রশ্ন উঠতে থাকে। তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যে অভিযোগ তা হচ্ছে জনস্বাস্থ্য সংকট ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা। আর এই ব্যর্থতার কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হামের প্রকোপ বেড়ে বহু শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে উল্লেখ স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা না দেওয়ার খেসারত এখন আমাদের দিতে হচ্ছে। আমরা সারা দেশে একযোগে টিকাদান কর্মসূচি চালু করলেও টিকার কার্যকারিতা শুরু হতে কিছুটা সময় লাগছে। কিন্তু এরকমটা তো হওয়ার কথা ছিল না। বাংলাদেশ অনেক আগেই টিকাদানে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। আমাদের ইপিআই ব্যবস্থার জন্য নানা সময় বিশ^জুড়ে আলোচিতও হয়েছে। কিন্তু একটি সরকারের অনীহার কারণে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে মৃত্যু হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুদের। এটা মেনে নেওয়া আসলেই কষ্টের। তবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি চিকিৎসা দিয়ে হোক, টিকা দিয়ে হোকÑ যেভাবে পারা যায় এটিকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার। আশা করছি কিছুদিনের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে চলেও আসবে।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনের মানববন্ধনেও বক্তারা দাবি করেন টিকা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা এই সংকটকে তীব্র করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, টিকাদান ব্যবস্থায় বিঘœ ঘটায় মৃত্যুহার বেড়েছে এবং এর দায় স্বাস্থ্য প্রশাসনের ওপর বর্তায়।

নূরজাহান বেগম এবং ডা. সায়েদুর রহমানের সময় হাসপাতালগুলোতে অন্যতম বড় সংকট ছিল চিকিৎসক সংকট (প্রায় ১০ হাজার)। এই সংকট দীর্ঘদিনের হলেও তা মারাত্মক আকার ধারণ করে এই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। যে সংকট কাটাতে বর্তমান সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে লাখের ওপর স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়ার কথা ঘোষণা দিয়েছে।

একটি সংবাদমাধ্যমের কাছে ডা. সায়েদুর রহমান অবশ্য দাবি করেছেন, আগের পদ্ধতিটি জরুরি অবস্থার জন্য তৈরি একটি আইনি ধারার ওপর ভিত্তি করে হয়েছিল। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তারা নিয়মিত নিয়মে আনতে চেয়েছিলেন। তিনি টিকার অভাব ও মৃত্যুর ঘটনায় শোক প্রকাশ করে বলেন, হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুর মৃত্যু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। কিন্তু নিজে কোনো দায়ভার নিতে নারাজ।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!