যশোরের শার্শা ও বেনাপোল সীমান্ত এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই স্বর্ণ চোরাচালান, মাদক পাচার, চাঁদাবাজি ও সীমান্তভিত্তিক অপরাধের জন্য আলোচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসব কর্মকা-ের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে যুবদল নেতা শহিদুল ইসলাম শহীদ ওরফে ‘গোল্ড শহীদ’-এর নাম। স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমান্তজুড়ে এমন এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যেখানে টাকার বিনিময়ে মামলা ম্যানেজ, অপরাধীদের আশ্রয় এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটানো- সব কিছুই সম্ভব হয়ে উঠেছে।
সূত্র মতে জানা গেছে, সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে দুদকে ও পুলিশ সদর দপ্তরে অভিযোগ পড়লে তিনি এক প্রতিমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে আমেরিকার এক প্রবাসী বড় ভাইয়ের গাড়িতে পুলিশ সদর দপ্তরের তলবে এসেছিলেন গোল্ড শহীদ। তার সঙ্গে কামাল নামের এক ব্যক্তিও এসেছিলেন।
যশোর এলাকাবাসীর দাবি, গোল্ড শহীদ যশোরের এক প্রতিমন্ত্রী যশোর জেলা যুবদলের আনসারুল হক রানার নাম বিভিন্ন মহলে ভাঙিয়ে অবৈধ গোল্ডসহ টাকার পাহাড় গড়েছেন। সিরাজ নামের এক ব্যক্তি জানান, এর আগে গোল্ড শহীদ ফেনসিডিল ও গোল্ডের ব্যবসা করে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এর মধ্যে তার ২টি প্রাডো ও একটি গোল্ড পাচারের গাড়ি রয়েছে, সেটি ব্যবহারের সময় একেক সময়ে গাড়ির নম্বর পরিবর্তন করে যশোরের বিভিন্ন সীমান্ত পথ দিয়ে অপরাধ করেই আসছে। তার নামে ফেনসিডিলসহ একাধিক মাদক ও মানুষের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা রয়েছে।
গোল্ড শহীদকে ঘিরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট শুধু স্বর্ণ চোরাচালানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মাদক পাচার, ভয়ভীতি সৃষ্টি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমেও তারা পুরো অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রেখেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বললেই শুরু হয় হুমকি-ধমকি। ফলে অনেকেই ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শার্শা উপজেলার ইউনুস আলী হত্যা মামলার ৩২ বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক পলাতক আসামিকে দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় দিয়ে আসছেন গোল্ড শহীদ। শার্শা থানার মামলা নং-৯২ (২৩/১০/১৯৯৭), জিআর মামলা নং-৪৭৪/১৯৯৭ এবং দায়রা মামলা নং-২৪৮/২০০৩-এর ৩ নম্বর আসামি ছিলেন তিনি। যশোরের বিশেষ দায়রা জজ আদালত ২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তাকে ৩২ বছরের কারাদ- দেন। তবে রায়ের সময় থেকেই তিনি পলাতক রয়েছেন। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, এই সাজাপ্রাপ্ত আসামিসহ আরও বেশ কয়েকজন অপরাধী গোল্ড শহীদের ছত্রচ্ছায়ায় সীমান্ত এলাকায় নিরাপদে অবস্থান করছেন।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করা স্বর্ণের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। আগে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সীমান্তের এসব চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে বিএনপি ও যুবদলের কিছু নেতাকর্মীর হাতে চলে গেছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে ধারণা করা হচ্ছে। এই চক্রের সঙ্গে যশোর জেলা যুবদলের সদস্যসচিব আনসারুল হক রানা, শার্শা উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক গোল্ড শহীদ এবং আওয়ামী লীগ আমলের চোরাচালান সিন্ডিকেটের আলোচিত ব্যক্তি ‘গোল্ড নাসির’-এর নাম বারবার উঠে আসছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তের দুর্বল পয়েন্ট ব্যবহার করে স্বর্ণ দেশে আনা হয়। পরে ব্যক্তিগত গাড়ি, কুরিয়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দ্রুত তা দেশের বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, এটি এখন একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক অপরাধচক্রে রূপ নিয়েছে।
সম্প্রতি যশোর শহরের আরবপুর এলাকা থেকে কলেজ শিক্ষার্থী ফাইমুর রহমান সানের ব্যবহৃত একটি প্রাইভেট কার ছিনতাইয়ের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় আসে। পুলিশ মাগুরা থেকে গাড়িটি উদ্ধার করে। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, এটি সাধারণ ছিনতাই নয়; বরং স্বর্ণ পাচার-সংশ্লিষ্ট অর্থ বা সম্পদ নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধের অংশ।
এদিকে ভাইরাল হওয়া একটি অডিও ক্লিপ নিয়েও সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। সেখানে মাগুরা যুবদলের সভাপতি ওয়াসিকুর রহমান কল্লোলকে এক নারীর সঙ্গে কথোপকথনে শোনা যায়, যেখানে পাচারকৃত স্বর্ণ, গাড়ি এবং অপহরণের হুমির প্রসঙ্গ উঠে আসে। কথোপকথনে একপর্যায়ে একটি প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রীর নামও উল্লেখ করা হয়। যদিও সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি এবং অভিযোগের সত্যতা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি, তবুও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গোল্ড শহীদের সিন্ডিকেট শুধু সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান নিয়ন্ত্রণই করছে না; বরং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে প্রশাসনিক কার্যক্রমেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। অনেক ক্ষেত্রে থানায় অভিযোগ বা মামলা ও প্রভাব খাটিয়ে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। যশোর জেলা যুবদলের সাবেক প্রচার সম্পাদক ইস্কান্দার আলী জনি এক ফেসবুক লাইভে অভিযোগ করে বলেন, ‘গোল্ড শহীদকে দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা গায়েবি ডায়েরি করানো হয়েছে।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে এর আগে শার্শা উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক, শহিদুল ইসলাম শহীদ (গোল্ড শহীদ) রূপালী বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, এসব কিছু আমি জানি না।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গোল্ড শহীদের মাফিয়া সাম্রাজ্য : যশোর-বেনাপোল সীমান্তে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য অপরাধ সাম্রাজ্য; যেখানে স্বর্ণ চোরাচালান, ভয়ভীতি প্রদর্শন, নির্যাতন, খুন, রাজনৈতিক এবং অবৈধ সম্পদের প্রভাব বিস্তার একসঙ্গে জড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার দক্ষিণ ভাদলি গ্রামের সাগর হত্যার অনুসন্ধানে গিয়ে নতুন করে সামনে এসেছে এই সোনা চোরাচালান চক্র। এসব ঘটনা অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে পুলিশ সদর দপ্তর, দুদক ও গোয়েন্দারা।
জানা গেছে, এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অভিযোগে প্রাথমিকভাবে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যেসব সদস্যের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এই চক্রের বিষয়ে কেন্দ্রীয় যুবদল একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এরই মধ্যে কাজও শুরু করেছে। যদিও তদন্ত কমিটি এসব অপরাধীর কাছ থেকে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণ পেলেও এসব অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় যুবদল তেমন কোনো সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেয়নি। তারা ৭ দিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন বলে জানালেও অনেক দিন হলো টাকা খেয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ করেছেন যশোর জেলার সাবু, আরিফ, মুন্না, রহিমÑ সব বেশ কিছু বিএনপির অঙ্গসংগঠন ও বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। এসব বিষয়ে যুবদলের তদন্ত কমিটির প্রধান জানান, এই অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হয়। গোয়েন্দা তথ্য ও একটি অডিও কল রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এই পাচারচক্রের মূল হোতা হিসেবে যাদের নাম আসছে তারা হলেনÑ যশোর জেলা যুবদলের সদস্যসচিব আনসারুল হক রানা, শার্শা উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম শহীদ ওরফে গোল্ড শহীদ এবং আওয়ামী লীগ আমলের স্বর্ণ চোরাচালান ও মাদক সিন্ডিকেটের হোতা মেহেরুল্লাহ মেম্বার ও বেনাপোলের গোল্ড নাসির।
এই বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনেও একাধিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং দুদক এই অভিযোগ নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক উপপরিচালক এই প্রতিবেদককে জানান, এসব অভিযোগের পরই সীমান্তে দুদকের গোয়েন্দা টিম কাজ করছে এবং সম্প্রতি এই চক্রের একজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
দলীয়ভাবে গঠন করা তদন্ত কমিটির সদস্য যুবদলের শীর্ষ নেতা অ্যাডভোকেট তানভীর হাসান সোহেল জানান, দল কোনো অপকর্মের পক্ষে নেই। যুবদল সারা দেশে মানুষের মনে যে জায়গা করে নিয়েছে, সেটা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হোক সেটা তারা চান না। যুবদল এ ধরনের অভিযুক্ত সবার বিরুদ্ধে আইনগত ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
এদিকে এই সংবাদ প্রকাশের পরে গোল্ড শহিদ ও তার সংঘবদ্ধ দল আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং যারা তথ্য সরবরাহ করছে অনুমান করে তাদের প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। ভুক্তভোগী ও নির্যাতিতরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মাঝে দিন কাটাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে রেঞ্জ ডিআইজি খুলনা বরাবর গোল্ড শহীদের নির্যাতনে মারা যাওয়া সাগরের পরিবারকে আইনি সহায়তা প্রদানের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। রেঞ্জ ডিআইজি খুলনা অফিস পুলিশ সুপার যশোর জেলাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছে।
নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক দুদকের এক উপপরিচালক রূপালী বাংলাদেশকে জানান, এসব অভিযোগ পড়ার পরেই সীমান্তে দুদকের গোয়েন্দা টিম কাজ করছে এবং প্রশাসনের সহায়তায় একজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
এদিকে এসব অপকর্ম ঢাকতে যশোর জেলা যুবদলের সদস্যসচিব আনসারুল হক রানা দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের এই প্রতিবেদককে হামলা, মামলা ও খুনের হুমকি দেন। যুবদল নেতা রানা একটি লিগ্যাল নোটিশে জানান, দৈনিক রূপালী বাংলাদেশে যে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে সেটা ষড়যন্ত্র। আমি এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি। অন্যথায় মামলার হুমকি দেন তিনি।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির তদন্ত টিমের প্রধান শাহ নাসির উদ্দিন রুমান রূপালী বাংলাদেশকে জানান, আমরা অভিযোগের প্রমাণ পেলে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটিকে জানিয়ে থাকি। কেন্দ্রীয় কমিটি এসব বিষয়ে অভিযোগ পেলে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এখনো তদন্ত চলছে, আমরা যশোর আছি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন