রাজধানীতে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক, কিশোর গ্যাং, অনলাইন জুয়া ও সাইবার প্রতারণার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নতুন কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, অপরাধী যে-ই হোক, তার রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না।
গতকাল বুধবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন ডিএমপি কমিশনার। রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মন্তব্য করে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে চাই। ঢাকা মহানগরে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম মূল অঙ্গীকার আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। ঢাকা মহানগরীতে এই লক্ষ্য অর্জনে ডিএমপি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সম্প্রতি সমাপ্ত পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬-এর স্লোগান ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ আমাদের দর্শনকে প্রতিফলিত করে। আমরা জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে চাই।
মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘একটি নিরাপদ, অপরাধমুক্ত ও শান্তিময় রাজধানী গড়ে তুলতে ডিএমপি কাজ করছে। এই যাত্রায় গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী ভূমিকা পালন করছে।’ ডিএমপি কমিশনার বলেন, প্রায় তিন কোটি মানুষের এই নগরীতে ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং, অনলাইন জুয়া, সাইবার প্রতারণা ও হ্যাকিং বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অপরাধ দমনে গত ১ মে থেকে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে ডিএমপি।
তিনি বলেন, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে ডিএমপির সাইবার ইউনিটকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। ডিবি কার্যালয়ে স্থাপিত ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব সম্প্রতি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) মন্ত্রণালয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে। এটি সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রাজধানীর যানজট প্রসঙ্গে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এআইভিত্তিক ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে ই-প্রসিকিউশনও চালু করা হয়েছে। কমিশনার বলেন, নাগরিকদের অনলাইন জিডি করার সুবিধাসহ সব ধরনের অপরাধের তথ্য শেয়ার করার জন্য ‘হ্যালো ডিএমপি’ এবং হোটেলে অস্থানকারী সন্দিগ্ধ ব্যক্তি ও অপরাধী শনাক্তকরণের নিমিত্তে ‘হোটেল বোর্ডার সিস্টেম’সহ বেশ কিছু প্রযুক্তিনির্ভর অ্যাপস চালু করা হয়েছে। ডিএমপিকে আরও জনবান্ধব, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক করতে পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।
আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর হাট, ঈদ জামাত, শপিং মল ও আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা আমাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ঘরমুখী মানুষের নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশনে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও অতিরিক্ত যাত্রী বহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঈদের ছুটিতে নগরীর নিরাপত্তায় অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হবে। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে নগদ টাকার লেনদেন কমিয়ে ব্যাংকে লেনদেন করার জন্য এবং বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন করলে পুলিশের সহযোগিতা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, আসন্ন ঈদকে ঘিরে অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি, ছিনতাইকারী ও জাল নোট প্রতিরোধে ডিবি ও থানা পুলিশকে সক্রিয় করা হয়েছে। ডিএমপির প্রতিটি থানায় মতবিনিময় সভা করা হচ্ছে। আমরা ঢাকার সম্মানিত নাগরিকদের মতামত নিয়ে সর্বোত্তম পুলিশি সেবা দিতে চাই। অনেক ক্ষেত্রে জনসাধারণের সহযোগিতা ছাড়া আমাদের কাজ করা দুরূহ। চাঁদাবাজি, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সমাজের সবাই মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
ঢাকার এই বিশাল জনসমষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পুলিশের একার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। আইনশৃঙ্খলার টেকসই উন্নয়ন এবং একটি নিরাপদ নগরী গড়ে তুলতে আমি সম্মানিত নগরবাসীর আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি। আপনার এলাকায় কোনো ছিনতাইকারী, কিশোর গ্যাং, মাদক কারবারি কিংবা চাঁদাবাজের তথ্য থাকলে অবিলম্বে পুলিশকে জানান। প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করে জানান, পুলিশ তড়িৎ ব্যবস্থা নেবে। পুলিশের কোনো সদস্য যদি ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব কওে, তার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর।
মিট দ্য প্রেসে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম) মো. মাসুদ করিম, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রটেকশন অ্যান্ড ডিপ্লোমেটিক সিকিউরিটি) সানা শামীনুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এস্টেট, ডেভেলপমেন্ট ও আইসিটি) মোহাম্মদ ওসমান গণি, পিপিএম, যুগ্ম পুলিশ কমিশনারগণ, উপ-পুলিশ কমিশনারগণ, বিভিন্ন পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তাগণ ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

