আজকাল আকাশটা কেমন যেন চুপচাপ, নিথর। বাতাসেও বইছে এক অদৃশ্য হাহাকার। মনে হয়, বৃষ্টির ফোঁটাতেও ঝরে চোখের নোনা পানি। আর সেই পানির সঙ্গে মিশে যায় হৃদয়ের কান্না। কালো মেঘে খুঁজে পাই হাজারো কান্নার সমবেত সুর। বজ্রপাতকে মনে হয় শিশুর আর্তনাদ। সকালে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকা স্পর্শ করতে গেলে হাত কেঁপে ওঠে। টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখতে গেলে কেঁপে ওঠে বুক। কান্নায় ঝাপসা হয়ে ওঠে চোখ। একের পর এক কষ্টের খবর। ধর্ষণ, নির্যাতন, গলা কেটে হত্যা। গতকাল বুধবার পল্লবীতে সাত বছর বয়সের এক শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার খবর যেন আর দশটা দিনের মতোই শীতল ভাষায় ছাপা হলো। ভাবা যায়? সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর তার গলা কেটে শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়! অথচ সেই শিশুটির একটা নাম ছিল, মুখে হাসি ছিল, তার একটা ছোট্ট স্কুলব্যাগ ছিল, রংপেন্সিল ছিল। আমাদের সমাজ কি এতটাই নির্লজ্জ হয়ে গেছে যে, শিশুদের রক্তও এখন আর বিবেকে আগুন ধরায় না? প্রশ্নটা এখন কেবল আবেগের নয়, গভীর সমাজতাত্ত্বিক ও অপরাধতাত্ত্বিক সংকটের।
এই ধরনের নৃশংস ঘটনার বর্ণনা বা স্মৃতি ভাষায় আনা সহজ নয়। আর কিইবা লিখব? শিশুদের এই মৃত্যু কোনো সংবাদ নয়। এগুলো সভ্যতার আত্মসমালোচনা। প্রতিবার এমন ঘটনা ঘটলে আমরা ক্ষণিকের জন্য শিউরে উঠি, প্রতিবাদ করি। আজকের মতো লিখতে বসি। তারপর আবার নীরবতার চাদরে ঢেকে যাই। কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই জমে ওঠে আরও একটি ট্র্যাজেডির বীজ।
একটি শিশুর নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বরই বলে দেয়- সভ্যতা আজ কোথায় দাঁড়িয়ে। যেখানে শৈশব নিরাপদ নয়, সেখানে রাষ্ট্র শুধু একটি নামমাত্র কাঠামো। একটি জীবন নিভে গেলে কেবল একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজ অন্ধকারে ঢেকে যায়। নিরাপত্তাহীন শৈশব মানে ভবিষ্যতের শিকড় কেটে ফেলা। প্রতিটি শিশু হত্যার পেছনে শুধু একজন অপরাধী নয়, ব্যর্থতার একটি দীর্ঘ ইতিহাস থাকে। মানবতার সবচেয়ে বড় পরাজয়- শিশুর হাসি থেমে যাওয়া।
যে সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল সদস্যকে রক্ষা করতে পারে না, সে সমাজের উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যানের খেলা। আইনের কঠোরতা, প্রশাসনের উপস্থিতি- সবই তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, যখন একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
আমাদের সমাজে সহিংসতা যেন এখন নিত্যদিনের অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক ভাষা থেকে পারিবারিক আচরণ- সবখানেই আগ্রাসন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। শিশুরা সেই আগ্রাসনের সবচেয়ে সহজ শিকার। কারণ তারা প্রতিবাদ করতে পারে না। আমরা শিশুকে মানুষ হিসেবে দেখি না, সম্পত্তি হিসেবে দেখি। ফলে তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আর দখলদারির মানসিকতা কাজ করে। যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রেও ক্ষমতা প্রদর্শনই বড় কারণ।
বেশির ভাগ ঘটনার ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অপরাধী পরিচিত মানুষ- আত্মীয়, প্রতিবেশী, এমনকি পরিবারের সদস্য। শিশুর প্রতি অপরাধ অনেক সময় পরিকল্পিত নয়, সুযোগসন্ধানী। আর যখন অপরাধী দেখে যে, সামাজিক লজ্জা পাল্টা ভুক্তভোগীর ওপরই চাপানো হয়, তখন সে আরও বেপরোয়া হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের আরেকটি বড় কারণ হলো, ‘ইমপিউনিটি কালচার’। অর্থাৎ অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি। বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ, শাস্তি নিশ্চিত নয়। ফলে অপরাধীর মনে ভয় থাকে না। আমাদের বুঝতে হবে যে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধকে টিকিয়ে রাখে। দ্রুত বিচার না হলে প্রতিরোধ হয় না।
তবে এটাও সত্য যে, পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটিও দুর্বল হয়ে পড়ছে। আগে পরিবার ছিল সামাজিক নিয়ন্ত্রণের প্রধান জায়গা। এখন ভাঙন, বিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক চাপ। সব মিলিয়ে পরিবার নিজের ভিত হারাচ্ছে। ফলে সেখানে শিশুরা সুরক্ষা পাচ্ছে না। আমরা এখনো ‘ঘরের ব্যাপার ঘরে মিটুক’ সংস্কৃতিতে আটকে আছি। ফলে শিশুর কণ্ঠও চাপা পড়ে যায়। পরিবারভিত্তিক সচেতনতা, ‘গুড টাচ-ব্যাড টাচ’ শিক্ষা, স্কুলভিত্তিক জীবনদক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় শিশু সুরক্ষা কমিটি সক্রিয় না হলে কেবল আইন দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়।
আমি মনে করি, পরিবারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আমরা অপরাধের পর তৎপর হই, প্রতিরোধে নয়। শিশু সুরক্ষায় স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি, কাউন্সেলিং, স্কুলভিত্তিক সচেতনতা- এসবের ঘাটতি স্পষ্ট।
আমার এক বন্ধু মনোবিজ্ঞানী বললেন, অবাধ পর্নোগ্রাফি ও সহিংস কনটেন্টের সহজলভ্যতা কিশোর-তরুণদের মানসিক বিকার বাড়াচ্ছে। যৌনতা সম্পর্কে বিকৃত ধারণা, সহানুভূতির অভাব এবং রাগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা- এই তিনটি উপাদান শিশু নির্যাতনের অনেক ঘটনায় দেখা যায়। আমাদের দেশে যৌন শিক্ষা নেই, মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা নেই। ফলে পর্নোগ্রাফি ও সহিংস কনটেন্ট থেকে পাওয়া বিকৃত কৌতূহল অপরাধে রূপ নেয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ সত্য হচ্ছে, অনেক শিশু পরিবার বা ঘনিষ্ঠজনদের দ্বারাই নির্যাতনের শিকার। আরও সত্য যে, এ ধরনের বেশির ভাগ ঘটনা প্রকাশই পায় না। লজ্জা, ভয়, সামাজিক কলঙ্ক- সব মিলিয়ে সত্য চাপা পড়ে থাকে।
আমি একটা বিষয় আজও বুঝে উঠতে পারি না। এ ধরনের ঘটনা আজ নতুন নয়। কিন্তু বেড়ে ওঠার যে হার সেটা অনেক বেশি। মাঝে মধ্যে মনে হয়, রাষ্ট্র কি ব্যর্থ? আইন কি অন্ধ? বিচার ব্যবস্থা কি থমকে গেছে? প্রতি বছর ৪০টি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হচ্ছে। প্রতি বছর এ ধরনের অপরাধে ফাঁসি কার্যকর হয়েছে কয়টি? সাজা পেয়েছে কতজন? বিচার প্রক্রিয়া কেন এত জটিল হচ্ছে? একটি ঘটনার বিচারকাজ শেষ হতে বছর নয়, যুগ পার হয়ে যায়। কেন? দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন আছে, আছে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু বিচার পেতে বছরের পর বছর পার হয়ে যুগ কেটে যায়। অনেক সময় সাক্ষী সুরক্ষার অভাবে আর প্রমাণ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মামলার বাদী হেরে যান। আর অনেক মামলায় আপসের চাপ তো আছেই।
দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জরুরি হলেও সঙ্গত কারণে একই সঙ্গে এটাও জানতে ইচ্ছে করে, শিশু সুরক্ষা কি কেবলই আইন দিয়ে সম্ভব? আমার মনে হয়- না। প্রশাসন, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সহিংসতা যখন সামাজিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন সবচেয়ে দুর্বলরাই তার শিকার হয়, শিশুরা প্রথম সারিতে থাকে। শিশু নির্যাতন কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি সভ্যতার সংকট। আমরা কেমন সমাজ গড়ছি, সেটার প্রতিফলন। একটা সুন্দর আর সুস্থ সমাজ না গড়লে, চলমান সমাজ কি এই নোংরা আর নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাবে না?
এই বেদনা শুধু শোক নয়, এটি এক অনিবার্য আহ্বান : নীরবতা ভেঙে সব দায় স্বীকার করে, একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ার দিকে এগিয়ে যাওয়ার।
পল্লবীর সেই শিশুটি আর ফিরবে না। তার স্কুলব্যাগ হয়তো এখনো দরজার কোণে ঝুলছে। রংপেন্সিলের বাক্স খোলা, আঁকা অসমাপ্ত। তার খাতায় হয়তো এখনো অর্ধেক লেখা অংক। বাবা-মায়ের চোখে আজ ঘুম নেই। কিন্তু যে বিবেক আজ অমানুষের চাদর গায়ে দিয়ে ঘুমিয়ে আছে, তাদের জাগাবে কে?

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন