ঢাকঢোল পিটিয়ে বিগত আওয়ামী সরকার সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে (অফশোর) তৈরি করেছিল উৎপাদন অংশীদার চুক্তি (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট-পিএসসি)। তখন ঢালাওভাবে বলা হয়েছিল, প্রায় ১৭টি বড় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোম্পানি কিনেছে পিএসসি। এর ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর আহ্বান করা হয় দরপত্র। কিন্তু ওই পিএসসির আওতায় কোনো বিদেশি কোম্পানিই আগ্রহ দেখায়নি অনুসন্ধান কার্যক্রমে। দরপত্র জমা দেয়নি একটি কোম্পানিও। বলা যায়, এতদিন কার্যত স্থবির ছিল সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের পুরো প্রক্রিয়া। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার ৩ মাসের মাথায় দ্বার খুলছে সমুদ্রে তেল-গ্যাসে অনুসন্ধানের। কাল শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের অফশোর তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান।
এর জন্য নতুন করে পিএসসি তৈরি করার কথা থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাক্সবন্দি ছিল সব ফাইল। তারা শুরুতে এই কার্যক্রমে প্রচ- আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যায়ে সব তালগোল পাকিয়ে ফেলে। ফলে বিদেশি কোনো কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ দূরের কথা, দেশীয় বাপেক্সকেও অফশোরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য কোনো কার্যক্রমের তাগিদ দেওয়া হয়নি। ফলে অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম আদৌ শুরু হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে জ¦ালানি বিভাগ নিশ্চিত করেছে যেহেতু সরকারের নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী আগামীকাল শনিবার অফশোরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের সব প্রস্তুতি নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বৃহস্পতিবার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আগামী রোববার এটি শুরু হওয়ার কথা ছিল। যেহেতু মাঝখানে ঈদের বড় ছুটি রয়েছে। তাই আমরা যত দ্রুত সম্ভব এর কাজ শুরু করতে চাচ্ছি। তাই শনিবারই হয়তো দরপত্র আহ্বানের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে। জ¦ালানি বিভাগ এবং পেট্রোবাংলা ইতোমধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বলেও জানান তিনি।
জানা যায়, আন্তর্জাতিক জ¦ালানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়াতে এবারের দরপত্র প্যাকেজকে আগের তুলনায় ‘আরও আকর্ষণীয়’ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংশোধিত গ্যাস মূল্যহার, পাইপলাইন নির্মাণ ব্যয় কমানো এবং ভূতাত্ত্বিক ও কারিগরি তথ্যের দাম কমানো হয়েছে। এর কারণ হিসেবে সচিব বলেন, আমাদের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ সংখ্যক বিদেশি কোম্পানির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এই দরপত্রের প্রচারের অংশ হিসেবে রোডশো আয়োজন এবং বিদেশি দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তাই নতুন শর্ত ও প্রচারের মাধ্যমে এবার বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ভালো সাড়া মিলবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দেশের স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে স্থানীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ করছিল গ্যাস উত্তোলনকারী বেশ কয়েকটি বিদেশি কোম্পানি। কিন্তু সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন স্থগিত করায় এখন আর সেভাবে কাজ পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে গ্যাসের অনুসন্ধান জোরদার করতে অনশোর (স্থলভাগে) অনুসন্ধান কার্যক্রমের পিএসসি চূড়ান্ত করে বিদেশি কোম্পানিকে স্থলভাগের খালি থাকা ব্লকগুলোয় কাজ দিতে চেয়েছিল পেট্রোবাংলা। বিশেষ করে পার্বত্যাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেয় সংস্থাটি। তাই স্থলভাগের জন্য প্রায় তিন দশক আগে করা পিএসসি সংশোধনের কাজ শুরু হয়। তৈরি করা হয় নতুন খসড়া। সেটি চূড়ান্ত করতে গত ডিসেম্বরের মধ্যে পরামর্শক নিয়োগ শেষ করতে চেয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তার কোনোটিই করা যায়নি।
এদিকে জলভাগে অর্থাৎ সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছিল, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে তৈরি করা হয়েছে ইতিহাসের সেরা পিএসসি। কিন্তু ফল এসেছে শূন্য। বিশ্বের কোনো একটি কোম্পানিও আগ্রহ দেখায়নি দেশের সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধানে। একটি কোম্পানিও জমা দেয়নি দরপত্র। কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছে, গভীর সমুদ্র থেকে স্থলভাগ পর্যন্ত পাইপলাইনের হুইলিং চার্জ, ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ), ডেটার দাম বেশি ধরা, পাশাপাশি দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
এখন এসব জায়গায় কাজ করে নতুন করে পিএসসি তৈরি করে দরপত্র আহ্বানের কাজ শুরু করলে কোম্পানিগুলো দরপত্র কিনতে আগ্রহী হবে বলে মনে করছেন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম। তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, কোনো দেশই ডেটার জন্য আলাদা মূল্য রাখে না। আমরা আসলে ডেটার ব্যবসা করব, নাকি গ্যাস দরকার, সেটা আগে চিহ্নিত করা দরকার ছিল। ডেটার দাম এত রাখার কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। ডেটা বিনা মূল্যে করে দিলেও কোনো ক্ষতি নেই। আমাদের তো গ্যাস দরকার। এর জন্য যা কিছু প্রয়োজন, সব করতে হবে। বিগত অনশোর পিএসসিতে আমরা দেখেছি, ডেটার জন্য আলাদা মূল্য ধরা হয়েছিল। অফশোরের পিএসসির বিষয়ে জানা গিয়েছিল, আগের পিএসসিতে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম ধরা হয়েছিল ব্রেন্ট ক্রুডের ১০ শতাংশ দরের সমান, যা আগের পিএসসিতে যথাক্রমে অগভীর ও গভীর সমুদ্রে ৫ দশমিক ৬ ডলার ও ৭ দশমিক ২৫ ডলার স্থির দর ছিল। দামের পাশাপাশি বাংলাদেশের শেয়ারের অনুপাতও নামিয়ে দেওয়া হয়।
মডেল পিএসসি-২০১৯ অনুযায়ী গ্যাসের উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে বাংলাদেশের অনুপাত বাড়তে থাকে। আর কমতে থাকে বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ার। গভীর সমুদ্রে ৩৫ থেকে ৬০ শতাংশ এবং অগভীর সমুদ্রে বাংলাদেশের হিস্যা ৪০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত ওঠানামা করবে। কিন্তু এটি আকর্ষণীয় হওয়ার পরও কেন ওই পিএসসিতে কোনো কোম্পানি আগ্রহী হয়ে ওঠেনি জানতে চাইলে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, তখন এবং এখনো আন্তর্জাতিকভাবে তেল-গ্যাসের বাজারে একটা অস্থির সময় যাচ্ছে। এ রকম পরিস্থিতিতে আমাদের আমদানিতে বড় অঙ্কের অর্থ চলে যাচ্ছিল সরকারের কোষাগার থেকে। তাই আমরা দেশীয় অনুসন্ধানে গুরুত্ব দিয়েছিলাম। কিন্তু আপনারা জানেন অনির্বাচিত একটা সরকারের পক্ষে এ বিষয়ে খুব বেশি কিছু করার থাকে না। আওয়ামী লীগ সরকারের তৈরি করা পিএসসি অনুযায়ী কোনো কোম্পানিই দরপত্র জমা দেয়নি। তাই আমরা এটি নিয়ে নতুন করে কাজ শুরু করেছিলাম। পেট্রোবাংলা ইতিমধ্যে আগের পিএসসি সংশোধন করে একটা খসড়া তৈরি করেছে। কিন্তু আমরা ক্ষমতায় থাকাকালে চূড়ান্ত কিছু আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। তাই আমরা এটি নিয়ে এগুতে পারিনি।
তবে বর্তমান পিএসসিতে মার্কিন জ¦ালানি জায়ান্ট এক্সনমোবিল ও শেভরন ইতোমধ্যে এই দরপত্রে অংশগ্রহণে আগ্রহ দেখিয়েছে জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান টুকু রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে কিছু জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর অফশোর অনুসন্ধানে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তাই আমরা সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী। সম্প্রতি অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বঙ্গোপসাগরের অফশোর ব্লকের জন্য সংশোধিত প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট (পিএসসি) নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বাড়তি এলএনজি আমদানি, বৈশ্বিক জ্বালানির উচ্চ মূল্য এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মুখে রয়েছে। তাই স্থলভাগে যেমন আমরা অনুসন্ধানে গুরুত্ব দিচ্ছি তেমনি সমুদ্রেও অনুসন্ধানে হবে সমানভাবে।
জানা যায়, আগের দরপত্রগুলোতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর যেসব উদ্বেগ ছিল, সেগুলো সমাধানে নতুন আর্থিক ও চুক্তিগত শর্তে মোট ২৬টি অফশোর ব্লক প্রস্তাব করা হবে। বিদেশি কোম্পানিগুলোর মূল্য নির্ধারণ, ব্যয় পুনরুদ্ধার এবং পরিচালনাগত নমনীয়তা-সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য আগের পিএসসি পর্যালোচনা করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় অনুসন্ধান পর্যায়ে কোম্পানিগুলোকে বরাদ্দকৃত এলাকার মাত্র ২০ শতাংশ ছেড়ে দিতে হবে, যেখানে আগে ৫০ শতাংশ ছাড়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। এ ছাড়া, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে মুনাফার ৫ শতাংশের পরিবর্তে এখন মাত্র ১.৫ শতাংশ দিতে হবে। আগের আলোচনায় বিতর্কিত বিষয় ছিল পাইপলাইন ট্যারিফ। এখন সফল দরদাতাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে তা নির্ধারণ করা হবে এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের সম্পূর্ণ ব্যয় পুনরুদ্ধারের সুযোগ থাকবে। অফশোর প্রকল্পগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করতে গ্যাস মূল্য নির্ধারণেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন গ্যাসের দাম উচ্চ-সালফার ফুয়েল অয়েলের পরিবর্তে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
নতুন পিএসসি অনুযায়ী, গভীর সমুদ্রের গ্যাস উৎপাদনে তিন মাসের গড় ব্রেন্ট মূল্যের ১১ শতাংশ দেওয়া হবে (ফ্লোর মূল্য ৭০ ডলার, সর্বোচ্চ ১০০ ডলার), অগভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে ১০.৫ শতাংশ, স্থলভাগে উৎপাদিত গ্যাসের ক্ষেত্রে অবস্থানভেদে ৮-৮.৫ শতাংশ।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন