আরও একটি ঈদের আগমনী বার্তা শহর-গ্রামের হাটবাজারে উৎসবের রং ছড়াচ্ছে। আর সেই রঙের খেলার আড়ালে আরেকটি অন্ধকার বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। উৎসবের বাজারে হাসির শব্দ বাড়ার পাশাপাশি নীরবে বাড়ছে এক অদৃশ্য শঙ্কা। সেটা হচ্ছে, বাজারে ঘি, সেমাই, মসলাসহ বিভিন্ন ভেজাল পণ্যের সমারোহ। রান্নার স্বাদ ও সুগন্ধের মূল উপাদান এসব ঘি-মসলা নিয়ে এখন জনমনে উদ্বেগ, সন্দেহ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। বাজার ঘুরে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বললে অনেকেই অভিযোগ করেন, ঈদকে কেন্দ্র করে ঘি ও মসলার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় একটি অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ঘি, সেমাই ও গুঁড়া মসলাÑ হলুদ, মরিচ, ধনিয়া, জিরার ক্ষেত্রে এমনটা ঘটছে বেশি। এসব খাদ্যপণ্যের মধ্যে আসল উপাদানের পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রেই অতি সামান্য। কোথাও কোথাও নেই বললেই চলে। বরং তার জায়গায় মেশানো হচ্ছে ঘাসের বিচি, আটা, ইটের গুঁড়াসহ নানা ধরনের বিপজ্জনক উপকরণ। ঘিতে মেশানো হচ্ছে চর্বি আর ঘ্রাণ আনতে রাসায়নিক দ্রব্য। সব মিলিয়ে ঈদের আনন্দ যেন মানুষের নয়, ভেজাল কারবারিদের।
এমন অভিযোগ সারা দেশেই। জানা গেছে, পুরান ঢাকা, কামরাঙ্গীরচর, কেরানীগঞ্জ, টঙ্গীর কিছু পাইকারি বাজার এবং গ্রামাঞ্চলের ছোট-মাঝারি মিলগুলোকে কেন্দ্র করে এই ভেজাল চক্র গড়ে উঠেছে। সেখান থেকে পাইকারি দামে মসলা ঢোকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খুচরা বাজারে। এরপর পলিথিনে প্যাকেটজাত হয়ে, আবার কোথাও খোলাভাবে, কেজি দরে সাধারণ ক্রেতার রান্নাঘরে পৌঁছে যায় সেই পণ্য, যার ভেতরে স্বাদের চেয়ে বেশি থাকে সন্দেহের উপাদান। স্পষ্ট করে বললে, বিষের উপাদান।
বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যমতে, কিছু অসাধু উৎপাদনকারী ও প্যাকেটজাতকারী প্রতিষ্ঠান রং, স’মিলের করাতের গুঁড়াসদৃশ উপকরণ, শুকনো পাতা জাতীয় পদার্থ কিংবা অন্য নিম্নমানের মিশ্রণ ব্যবহার করছে।
ঈদ মানেই আনন্দ, পরিবার আর মিষ্টিমুখের প্রস্তুতি। কিন্তু সেই আনন্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অস্বস্তিকর সত্যÑ বাজারজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে ভেজাল সেমাই ও লাচ্ছা সেমাই। পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, খোলা ও ধুলাবালিপূর্ণ পরিবেশে তৈরি এবং বিক্রি হচ্ছে এসব সেমাই। আর এসব তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের ময়দা ও পুরোনো তেল। লাচ্ছা সেমাইয়ে অতিরিক্ত কৃত্রিম রং মেশানো হচ্ছে। চকচকে প্যাকেট, আকর্ষণীয় রং ও ‘দেশি ঘি’-এর লেবেল লাগানো কৌটায়ও রয়েছে বিষের উপাদান। দুধ বা দুগ্ধজাত উপাদান ছাড়াই এসব ‘ঘি’ তৈরি হচ্ছে। এসব ঘি তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে উদ্ভিজ্জ তেল ও কৃত্রিম ঘ্রাণ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. জাকিয়া ফেরদৌসী খান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এসব মসলার ভেজাল শুধু খাবারের সময় মুখের স্বাদ নষ্ট করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিও তৈরি করে। নানা বিষাক্ত ফেব্রিক কালার, বিভিন্ন অজানা রং বা রাসায়নিক মিশ্রণ লিভার, কিডনি ও হজম প্রক্রিয়ায় ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। শিশুদের ক্ষেত্রে মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। ক্যানসারে ঝুঁকি বাড়ে, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে এবং ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়ে। ভেজাল মসলার রং শুধু চোখকে ধোঁকা দেয় না, শরীরের ভেতরেও ধীরে ধীরে নানা ক্ষত তৈরি করে। তাই এসব ভেজাল মসলা মূলত নীরব বিষ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বহু বছর ধরেই খাদ্যে অননুমোদিত রং ও দূষিত অ্যাডিটিভ ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক করে আসছে। ফলে প্রশ্ন থেকে যায়, এত অভিযোগের পরও বাজারে এসব পণ্য কীভাবে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে? ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান মাঝেমধ্যে দেখা গেলেও তা কি যথেষ্ট? নাকি ঈদের মৌসুম এলেই এই চক্র আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে, আর নজরদারি তখন হয়ে পড়ে দুর্বল?
অধ্যাপক ডাক্তার সানোয়ার হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, খাদ্যে ভেজাল শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের বিষয়। ঈদের মতো সময়ে যখন ব্যবহার বেড়ে যায়, তখন ঝুঁকিও বহুগুণে বাড়ে। কিন্তু এটি যাদের দেখভালের দায়িত্ব তারা বিশেষ সুবিধা পেয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকেন। কারণ ঈদের আগে এই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট তাদের যেভাবেই হোক ম্যানেজ করে ফেলে।
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ মীর এলাহী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ভেজাল ঘি-মসলার বড় সমস্যা হলো এতে থাকা ভারী ধাতু ও কৃত্রিম রং এবং চর্বি, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহে জমে যায়। সিসা ও ক্রোমিয়াম যুক্ত রং স্নায়ুতন্ত্রে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। ভেজাল মসলা অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া নষ্ট করে, গ্যাস্ট্রিক, অ্যাসিডিটি, আইবিএস (ইরিটেবল বয়েল সিনড্রোম) বাড়ায় এবং খাবার শোষণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, মসলায় ব্যবহৃত কৃত্রিম রং, স্টার্চ বা অপ্রয়োজনীয় ফিলার দীর্ঘমেয়াদে অ্যালার্জি, হজম সমস্যা ও লিভারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে; কিন্তু সমস্যা হলো, এসব ক্ষতি তাৎক্ষণিক বোঝা যায় না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সায়েন্স ল্যাবরেটরির একজন খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষক জানান, ঈদের সময় চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দ্রুত উৎপাদনের চাপ তৈরি হয়, আর সেই সুযোগেই কিছু অসাধু চক্র মানহীন উপাদান মিশিয়ে বাজারে ছাড়ে এসব খাদ্যপণ্য। সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে বাজার থেকে সংগ্রহ করা কিছু মসলার নমুনায় কৃত্রিম রং ও অপ্রয়োজনীয় ফিলার ব্যবহারের নজির পাওয়া গেছে। বিশেষ করে মরিচের গুঁড়া ও হলুদে রং বাড়াতে সিনথেটিক রং মেশানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বাদামতলী, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী ও পুরান ঢাকার পাইকারি বাজারে খোঁজখবর নিয়ে দেখা ও জানা গেছে, খোলা মসলার পাশাপাশি নানা ধরনের প্রক্রিয়াজাত গুঁড়া মসলাও সেখানে ব্যাপকভাবে বিক্রি হচ্ছে, যার বড় অংশের উৎস ও মান নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। কারওয়ান বাজারের আড়তদার হাজি সিরাজ উদ্দিন এই প্রতিবেদককে বলেন, ভালো মসলার দাম বেশি। কিন্তু ঈদের সময় সবাই কম দামে বেশি চায়। তখন মিশ্রণটাই তাদের মহলে বেশি চলে। আসলে কে যে কতটা খাঁটি, সেটা বলা মুশকিল।
চকবাজার এলাকার ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, তারা বড় কোম্পানির কাছ থেকে প্যাকেট কিনে বিক্রি করেন। কিন্তু ভেতরে কী আছে, সেটা তো ল্যাবে গিয়ে দেখেন না। অথচ, গ্রাহক অভিযোগ করলে চাপ আসে তাদের ওপর। প্যাকেটজাত ব্র্যান্ডের মসলা নিয়ে অভিযোগ কম। অভিযোগ বেশি খোলা মসলা নিয়ে। অনেকেই মিল থেকে ভাঙানো খাঁটি মসলা ভেবে এগুলো কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। দোকানদাররাও ক্রেতাকে সেটাই বুঝিয়ে থাকে। উভয় কারণে এই মসলার ক্রেতা বেশি হয়। একই সঙ্গে খোলা মসলার চাহিদা বেশি, কারণ দাম কম। এসব কারণে তারাও খোলা মসলা বেশি রাখেন ও বিক্রি করেন।
শান্তিনগরের গৃহিণী ইভানা জামান এই প্রতিবেদককে বলেন, বাজারের যে অবস্থা তাতে এখন দামি ব্র্যান্ড কিনলেও বিশ্বাস করতে পারি না। আবার খোলা কিনলেও ভয় লাগে। ঈদের রান্না করতে গিয়ে এখন সবকিছু নিয়েই দ্বিধায় থাকতে হয়। মসলার ঘ্রাণের চাইতে রঙের গন্ধটাই বেশি নাকে লাগে। দাম ভালো দেখে মানও ভালো হবেÑ এটা ভেবে বা দেখে কিনি। কিন্তু রান্না করলে আগের মতো ঘ্রাণ পাই না। লাল মরিচ গুঁড়া আরও লাল, হলুদ গুঁড়া আরও উজ্জ্বল, জিরা-ধনিয়া যেন আরও ‘তাজা’। প্যাকেট খুললেই মনে হয়, সবই খাঁটি, সবই দেশি ঘ্রাণে ভরা। কিন্তু খাবারের সময় মনে হয় শুধু রং আর গুঁড়া মিশিয়ে দিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের একটি অংশ অবশ্য ক্রেতাদের ঢালাও অভিযোগকে পুরোপুরি স্বীকার করেন না। তাদের দাবি, বাজারে প্রতিযোগিতা ও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে কেউ কেউ মানের সঙ্গে আপস করেন, তবে সবাই ভেজাল মেশায়, এমনটি বলা ঠিক নয়। আবার কেউ কেউ দায় চাপান সরবরাহ চেইনের ওপর, যেখানে পাইকারি পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের অভাব রয়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) একজন অর্থনীতিবিদ কঠোর ভাষায় বলেন, যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, সেই রাষ্ট্রে উৎসবও এক ধরনের বৈষম্যের প্রদর্শনী হয়ে দাঁড়ায়। এই বাক্যগুলোই যেন বর্তমান বাস্তবতার আয়না। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সবাই জানে, কিন্তু কেউ থামায় না। সবাই দেখে, কিন্তু ব্যবস্থা নেয় না। আসলে প্রশাসনের নীরবতা, সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। ভেজাল মসলার এই বিস্তার কোনো গোপন বিষয় নয়। এটি বাজারের প্রকাশ্য সত্য। তবু প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া অনেকটা মৌসুমিÑ ঈদের আগে কিছু অভিযান, কিছু ছবি, কিছু বিবৃতি, তারপর নীরবতা। এই নীরবতাকেই এখন মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায়।
তিনি আরও বলেন, যখন বাজারব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়, তখন শুধু দাম নয়Ñ গুণগত মানও ধসে পড়ে। ভেজাল তখন শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতার দায় শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, পুরো নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন