দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আজহা। গতকাল সোমবার থেকে শুরু হয়েছে ঈদের ছুটি। এর আগে গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তাপপ্রবাহের তীব্র গরমে অস্থির ছিল জনজীবন। তবে গত রোববার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি হওয়ায় তাপমাত্রার পারদ কিছুটা নেমে স্বস্তি দিয়েছে মানুষকে। রোববারের পর গতকাল সোমবারও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারি বৃষ্টি হয়েছে। এতে জনজীবনে স্বস্তির ধারাবহিকতা থাকলেও রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে মানুষকে। এ ছাড়া ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়া মানুষকেও ভুগিয়েছে বৃষ্টি। পাশাপাশি রাজধানীর পশুর হাটগুলোতেও পানি ও কাদা জমে ভোগান্তিতে পড়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। এদিকে ২৮ মে বৃহস্পতিবার ঈদুল আজহার দিন এবং ঈদের আগের ও পরের দিনসহ আগামী ৫ দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।
কয়েক দিনের টানা ভাপসা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল ঢাকাবাসীর জীবন। তবে গত রোববার বিকেলের বৃষ্টিতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও রাতে আবারও ফিরে আসে ভাপসা আবহাওয়া। এমন আবহাওয়া ছিল গতকাল সকালেও। তবে দুপুর গড়াতেই হঠাৎ বদলে যায় প্রকৃতির রূপ। বেলা সোয়া ১১টা পর্যন্ত ঝকঝকে রোদ থাকলেও সাড়ে ১১টার পর ধীরে ধীরে কালো মেঘে ঢেকে যায় আকাশ। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দিনের আলো ম্লান হয়ে ভরদুপুরেই নেমে আসে সন্ধ্যার আবহ। পূর্ব আকাশে কালো মেঘের আনাগোনার পর শুরু হয় ঠা-া বাতাস। এরপরই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নেমে আসে বৃষ্টি।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, গতকাল দুপুর ১২টা থেকে বেলা ১টার মধ্যে শুধু রাজধানীতেই ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। কোনো এলাকায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে তাকে ভারি বৃষ্টি ধরা হয়। তবে শুধু রাজধানীতেই নয়, একই সময়ে ময়মনসিংহে ৪৭ মিলিমিটার, বগুড়ায় ৬১ মিলিমিটার, রংপুরে ৪০ মিলিমিটার ও টাঙ্গাইলে ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, রাজধানীতে কমলেও বৃষ্টি বাড়তে পারে নোয়াখালী ও কুমিল্লা এলাকায়। আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির জানান, আগামী ২৪ ঘণ্টায়ও দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে ঢাকা, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও পটুয়াখালী অঞ্চলে মৃদু তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে।
এদিকে টানা বৃষ্টিতে তাপমাত্রা কিছুটা কমে স্বস্তি পেলেও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার কারণে ভোগান্তিতে পড়ে নগরবাসী। রাজধানীর মতিঝিল থেকে রাজারবাগ-মালিবাগ হয়ে মগবাজার চৌরাস্তার বিশাল অংশ জুড়ে বৃষ্টির পানিতে তৈরি হয় জলাবদ্ধাতা। এর মধ্যে ভয়াবহ অবস্থা দেখা যায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের রাস্তায়। এখানে যাওয়া-আসা দুই দিকের সড়ক ডুবে যায় বৃষ্টির পানিতে। পানির কারণে যানবাহনের ধীরগতিতে সড়কে তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট। ঘণ্টাব্যাপী বাসে বসে থাকলেও নামার উপায় ছিল না, কারণ রিকশার চাকা পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছিল পানি। বাসযাত্রী-পথচারী সবাইকেই এই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অন্যদিকে রাজধানীর জিগাতলা, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
রাজধানীর ধানমন্ডির বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, ‘ধানমন্ডি থেকে নিউমার্কেট যাওয়ার এই রাস্তায় সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে আশপাশে অনেক ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন।’
রাজধানীর নিউমার্কেটের এক নম্বর গেটের সামনে সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। নিউমার্কেটের এই গেটের সামনে ফুটপাতের দোকানি জলিল বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই এখানে পানি জমে যায়। দীর্ঘদিন ধরেই এই সমস্যা নিয়ে দোকান করতে হচ্ছে।’
অন্যদিকে ঈদের ছুটি উপলক্ষে গতকাল থেকেই শুরু হয়েছে সরকারি ছুটি। ইতিমধ্যে মানুষ রাজধানী থেকে গ্রামের বাড়ির দিকে যেতে শুরু করেছেন। এর মধ্যেই এই বৃষ্টি ভোগান্তি সৃষ্টি করেছে। পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় বেড়েছে রিকশা ও যানবাহনের ভাড়া। এতে পথচারীদের চলাচলেও ধীরগতি দেখা গেছে। আবার বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন পশুর হাটেও সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। হাটের বিভিন্ন অংশে পানি ও কাদা জমে থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। ভোগান্তি পোহাতে হয় গরুগুলোকেও, পানির মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে তাদের। কোথাও আবার পশুগুলোকে কাদার মধ্যেই শুয়ে থাকতে দেখা গেছে। শনির আখড়া পশুর হাটের ভেতরের বেশির ভাগ অংশই ছিল কর্দমাক্ত। কোথাও কোথাও পানি জমে ছোট ডোবায় পরিণত হয়। বিক্রেতারা খড় ও বালু ফেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাতেও পুরোপুরি স্বস্তি মিলছে না।
ঈদে কমবে তাপমাত্রা : ঈদুল আজহার দিন এবং ঈদের আগের ও পরের দিনসহ আগামী পাঁচ দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। বিভিন্ন অঞ্চলে ঝোড়ো হাওয়া ও বজ্রসহ মাঝারি ধরনের বৃষ্টি এবং কোথাও কোথাও ভারি। কাল বুধবার থেকে সারা দেশে দিনের তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবিরের দেওয়া পূর্বাভাসে এ তথ্য জানানো হয়।
আবহাওয়া অফিস জানায়, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায়; ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা ও ঝোড়ো হাওয়া এবং বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে ভারি বর্ষণ হতে পারে।
এ ছাড়া ঢাকা, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও পটুয়াখালী জেলাসহ খুলনা বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। পাশাপাশি সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
কাল বুধবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
ঈদের দিন বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
২৯ মে শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন