এগারো বছর আগে এক শরতের রাতে বাকপ্রতিবন্ধী কিশোরীর আর্তনাদে কেঁপে উঠেছিল ঠাকুরগাঁওয়ের একটি গ্রাম। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। আপস-মীমাংসার প্রলোভন, ভয়ভীতি, সময়ক্ষেপণ আর দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার গোলকধাঁধা পেরিয়ে অবশেষে ন্যায়বিচার পেল সেই পরিবার। আলোচিত ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত মো. আবদুল মমিনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- ও দুই লাখ টাকা অর্থদ- দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে আসামির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে অর্থ আদায়ের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে; যা এ মামলার অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিক।
গতকাল মঙ্গলবার ঠাকুরগাঁওয়ের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আলী মনসুর (জেলা ও দায়রা জজ) এ রায় ঘোষণা করেন। আদালত বলেন, জরিমানার দুই লাখ টাকা ভুক্তভোগীর পুনর্বাসনে ব্যয় হবে। বর্তমান সম্পত্তি থেকে অর্থ আদায় সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে অর্জিত সম্পদ থেকেও তা আদায় করতে হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জরিমানার অর্থ অনাদায়ে আসামিকে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদ- ভোগ করতে হবে ধর্ষক মমিনকে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর রাত। ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার ভাংবাড়ী (বগুড়া পাড়া) গ্রামের একটি দরিদ্র পরিবারের ১৪ বছর বয়সি বাকপ্রতিবন্ধী কিশোরী ঘরে একা ছিল। তার মা পাশের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগে প্রতিবেশী জালাল বৈরাগী প্রামাণিকের ছেলে মো. আবদুল মমিন ঘরে ঢুকে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে মা মেয়েকে উদ্ধার করতে গেলে অভিযুক্ত তাকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে পড়ে থাকে তার স্যান্ডেল। পরে প্রতিবেশীরা এসে রক্তাক্ত অবস্থায় কিশোরীকে উদ্ধার করেন।
স্বজনদের অভিযোগ, ঘটনার পরই শুরু হয় বিচার ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা। স্থানীয়ভাবে আপসের প্রস্তাব, নানা ধরনের চাপ এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন সময় নষ্ট করার পর শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগীর পরিবার মামলা করে। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই।
বিচার চলাকালে আদালত চিকিৎসা প্রতিবেদন, আলামত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে প্রধান আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন। তবে আসামিকে পালিয়ে যেতে সহায়তার অভিযোগে অভিযুক্ত মো. এরশাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাকে খালাস দেন।
রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের স্পেশাল পিপি মো. এনতাজুল হক বলেন, ‘একটি বাকপ্রতিবন্ধী শিশুর ওপর সংঘটিত পাশবিক অপরাধের ঘটনায় দীর্ঘ ১১ বছর পর হলেও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই রায় ধর্ষকদের জন্য কঠোর বার্তা হয়ে থাকবে।’ অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী শেখ ফরিদ জানান, তারা রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।
এই মামলার রায় শুধু একজন ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আবারও সামনে এনেছে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, গ্রামীণ জনপদে আপস-মীমাংসার নামে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষার বাস্তবতা। একই সঙ্গে আদালতের সম্পত্তি নিলামে ক্ষতিপূরণ আদায়ের নির্দেশ দেখিয়ে দিল, সাজা শুধু কারাভোগেই সীমাবদ্ধ নয়, ভুক্তভোগীর অধিকার নিশ্চিত করাও বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন