উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষকে মৃত্যুপথে ঠেলে দেওয়া মানব পাচার কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি একটি সুসংগঠিত, বহুজাতিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে গড়ে ওঠা ভয়ংকর অপরাধ সাম্রাজ্য। ক্ষমতার ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা একটি মানব পাচার চক্র বছরের পর বছর ধরে হাজারো মানুষকে নিঃস্ব করেছে, অথচ এখনো পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না। যা দেশের আইনশৃঙ্খলার জন্য লজ্জাজনক ও উদ্বেগের কারণ।
রোববার রূপালী বাংলাদেশের ‘ভয়ংকর রুট, টার্গেট আমেরিকা’ শিরোনামের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে হাজারো মানুষকে নিঃস্ব করা এক ভয়ংকর চক্রের খবর। এই ভয়ংকর ফাঁদ পেতেছিল ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত পিয়ন জাহাঙ্গীর আলম ওরফে ‘পানি জাহাঙ্গীর’ এবং তার সহযোগীরা। উচ্চাভিলাষী জীবন ও আমেরিকার নাগরিকত্বের প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ থেকে ৮০ লাখ টাকার বিনিময়ে দুর্গম পথে মানুষ পাচার করেছে এই চক্র। ২০২০ ও ২০২১ সালে এই সিন্ডিকেট ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করিয়েছে।
ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলা, পানামা, কোস্টারিকা, নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস ও মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের এই পথ কেবল অবৈধই নয়, অনেক ক্ষেত্রে নিশ্চিত মৃত্যুর ফাঁদ। ঘন জঙ্গল, পাহাড়, ক্ষুধা, বন্যপ্রাণী, ডাকাত ও পাচারকারীদের নির্যাতনে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। যারা বেঁচে ফিরেছে, তারা হয়েছে সর্বস্বান্ত; সেই সঙ্গে ঋণের বোঝা আর ভাঙা স্বপ্ন নিয়ে দিনযাপন করছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এই মানব পাচার চক্রের মূল হোতারা কোনো প্রান্তিক দালাল নয়। তারা একসময় রাষ্ট্রক্ষমতার খুব কাছাকাছি অবস্থানে ছিলেন। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তারা ইমিগ্রেশন, বোর্ডিং পাস, ভিসা ও বিমানবন্দর পারাপার নির্বিঘ্ন করেছে—এমন অভিযোগ উঠে এসেছে একাধিক সূত্রে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ট্রাভেল এজেন্সি, জনশক্তি সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং ইমিগ্রেশন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এই পাচার ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছেন।
রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে থাকা লোকজনের সহযোগিতা ছাড়া হাজার হাজার মানুষকে এভাবে পাচার করা সম্ভব নয়। তাই বিগত সরকারের আমলে মানব পাচার শুধু একটি চক্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে রূপ দিয়েছিল চক্রটি। দেশে ফেরত আসা শত শত বাংলাদেশি এই পাচার চক্রের জীবন্ত সাক্ষী। তবু তাদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ না করা, পুনর্বাসনের উদ্যোগ না নেওয়া এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা না হওয়া রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা।
মানব পাচার দমন আইন থাকা সত্ত্বেও যদি তা প্রয়োগ না হয়, তবে সেই আইন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু বিবৃতি দেওয়া নয়। অবিলম্বে মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে। বিদেশে অবস্থানরত মূল হোতাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক আইনি ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে।
বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন, বিএমইটি এবং সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের জন্য আইনি সহায়তা, মানসিক পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। মানব পাচার কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষকে ক্রীতদাসের মতো ব্যবহার করা সভ্য রাষ্ট্রে চলতে পারে না।
আমরা মনে করি, মানব পাচার রোধে কোনো ব্যক্তির অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এর শিকড়ে আঘাত হানতে হবে। তা না করলে আজ যুক্তরাষ্ট্র, কাল ইউরোপ—গন্তব্য বদলাবে, কিন্তু উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখে মানুষের আহাজারি কমবে না। রাষ্ট্র যদি সত্যিই নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করতে চায়, তবে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ কেবল স্লোগান নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।

