আজকের পৃথিবীতে বিচার অনেক সময় আদালতের কাঠগড়ায় শুরু হয় না! শুরু হয় ক্যামেরার ফ্রেমে, টকশোর টেবিলে, ফেসবুকের মন্তব্যঘরে, কিংবা ইউটিউবের থাম্বনেইলে। সত্য আদালতে পৌঁছানোর আগেই জনমতের আদালতে দোষ-নির্দোষ নির্ধারিত হয়ে যায়। আর সেখানেই জন্ম নেয় এক বিপজ্জনক প্রবণতাÑ মিডিয়া ট্রায়াল। মিডিয়া ট্রায়াল মানে বিচারাধীন বা তদন্তাধীন কোনো বিষয়ে আদালতের রায় ঘোষণার আগেই সংবাদ পরিবেশন, বিশ্লেষণ, জনমত সৃষ্টি বা এমন উপস্থাপনা, যা কোনো ব্যক্তি বা পক্ষকে কার্যত দোষী বা নির্দোষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের বহু আলোচিত ফৌজদারি মামলায় মিডিয়া ট্রায়ালের বিরূপ প্রভাব স্পষ্ট। এটি সংবাদ পরিবেশনের স্বাধীনতার অংশ নয়, বরং অনেক সময় এটি বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর অদৃশ্য প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের আলোচিত কয়েকটি মামলা এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। সাগর-রুনি হত্যা মামলা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য জল্পনা-কল্পনা, সম্ভাব্য খুনি নিয়ে মিডিয়ায় অনুমাননির্ভর বিশ্লেষণ এবং তদন্তের বিভিন্ন গোপন তথ্যের ফাঁস জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। কিন্তু এত আলোচনার পরও বিচারিক সত্য এখনো অধরা। একইভাবে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা, রায়হান হত্যা মামলা, নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলা, কিংবা সম্প্রতি আলোচিত বিভিন্ন নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায়ও আমরা মিডিয়া ট্রায়াল প্রত্যক্ষ করেছি।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনও এই নীতিকে দৃঢ়ভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। জাতিসংঘ ঘোষিত ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস (ইউডিএইচআর)-এর অনুচ্ছেদ ১১(১) অনুসারে, কোনো ব্যক্তি আইন অনুযায়ী আদালতে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে নির্দোষ বলে গণ্য করতে হবে। অর্থাৎ, বিচার শেষ হওয়ার আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা মানবাধিকারের পরিপন্থি। একইভাবে ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর)-এর অনুচ্ছেদ ১৪(২)-এও নির্দোষ ধরে নেওয়ার নীতি নিশ্চিত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইন অনুযায়ী দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ বলে বিবেচিত হবেন। এই বিধান কেবল আদালতের জন্য নয়; বরং রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং গণমাধ্যমÑ সবার জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও আইনগত নির্দেশনা বহন করে।
ভারতে সুপ্রিম কোর্ট মিডিয়া ট্রায়ালের ঝুঁকি সম্পর্কে একাধিকবার সতর্ক করেছে। বিশেষভাবে সাহারা ইন্ডিয়া রিয়েল এস্টেট করপোরেশন লিমিটেড বনাম সেবি মামলায় আদালত বলেন, অতিরিক্ত ও প্রভাবসৃষ্টিকারী সংবাদ প্রচার বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নষ্ট করতে পারে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে আদালত সংবাদ প্রকাশ সাময়িকভাবে সীমিত করার আদেশ দিতে পারে, যাতে ন্যায়সংগত বিচার ব্যাহত না হয়। একইভাবে দিল্লির একটি আদালত ২০২১ সালে মন্তব্য করেন যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি ও দ-িত ব্যক্তির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তাই মিডিয়ার উচিত পুলিশ বা প্রসিকিউশনের বক্তব্যকে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন না করা। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টও বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ২০১৯ সালের বরগুনার রিফাত হত্যা মামলায় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেপ্তারের পর ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার আগেই পুলিশ সুপার এক ব্রিফিংয়ে তার সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করেন।
পরে ওই মামলায় হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ বলেন, তদন্ত চলাকালে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের আদালতে হাজির করার আগেই গণমাধ্যমে উপস্থাপন করা মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে অমর্যাদাকর ও অনুচিত হতে পারে। আদালত আরও বলেন, বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। এ ছাড়া ২০১২ সালেও হাইকোর্ট গ্রেপ্তার বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গণমাধ্যমে উপস্থাপন না করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
তবে বাস্তবে এই প্রবণতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি এবং এ বিষয়ে কার্যকর নীতিমালাও এখনো প্রণীত হয়নি। ফলে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত হচ্ছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(৩) স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনানুগ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকারী। একই সঙ্গে অনুচ্ছেদ ৩১ আইনের আশ্রয় লাভ ও আইনানুযায়ী আচরণ পাওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছে। অর্থাৎ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা সংবিধান স্বীকৃত ন্যায়বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অপরদিকে অনুচ্ছেদ ৩৯ মতপ্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেও এই স্বাধীনতা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা ও আদালতের মর্যাদার সীমার মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে। এখানেই মিডিয়ার স্বাধীনতা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ভারসাম্যের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আদালত অবমাননা আইন, ২০১৩-এর আলোকে বিচারাধীন বিষয়ে এমন মন্তব্য বা প্রকাশনা যা বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত ও আদালতের মর্যাদাকে ক্ষুণœ করে, তা আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য হতে পারে। একইভাবে দ-বিধি, ১৮৬০-এর মানহানিসংক্রান্ত বিধানও ব্যক্তি সুনাম রক্ষায় প্রাসঙ্গিক।
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে ভিডিও কনটেন্ট, টকশো, ফেসবুক লাইভ ও অনলাইন পোর্টালের শিরোনাম এমনভাবে সাজানো হয়, যেন আদালতের কাজ কেবল আনুষ্ঠানিকতা! এতে তদন্ত সংস্থা যেমন জনচাপের মুখে পড়ে, তেমনি বিচারকও এক ধরনের সামাজিক প্রত্যাশার আবরণে আবদ্ধ হন, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় প্রকাশ্য হস্তক্ষেপও বটে। যদিও বিচারক আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেন, তবুও সমাজমনস্তত্ত্বের এই চাপকে পুরোপুরি অস্বীকার করা কঠিন। আমাদের বুঝতে হবে, বিচারকরাও মানুষ। পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও মতামতের ঝড় ওনাদের অবচেতন মনেও আবেগ অনুভূতি তৈরি করে। আর এটা বিচারকদের বিচারিক কাজে অনেক ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
একইসঙ্গে মিডিয়া ট্রায়াল জনমনে আদালতের প্রতি অনাস্থা তৈরি করে। প্রায়শ: মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে ভুল প্রচারে সাধারণ মানুষ এক ধরনের রায় আশা করে। কিন্তু আদালতে সাক্ষ্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞ আদালত যখন অন্য কোনো রায় ঘোষণা করেন তখন সাধারণ মানুষ আদালতের ওপর ভরসা হারান। এখানে আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো, মিডিয়া ট্রায়াল অনেক সময় ভুলও হতে পারে। তদন্তের শুরুতে যাকে ঘিরে সন্দেহ তৈরি হয়, পরবর্তীতে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হতে পারেন। কিন্তু তৎক্ষণে তার সামাজিক সম্মান, পেশাগত অবস্থান এবং ব্যক্তিগত জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বস্তুত ডিজিটাল যুগে অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ভিউনির্ভর সাংবাদিকতা এবং ‘ব্রেকিং নিউজ’ সংস্কৃতি আইনি সীমারেখাকে প্রায়ই দুর্বল করে দেয়। তবে এর মানে এই নয় যে গণমাধ্যম নীরব থাকবে। গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই গণমাধ্যমের বিশেষ গুরুত্ব আছে।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক। অনেক সময় গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ, দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনা দ্রুত জনসমক্ষে তুলে ধরে, যার ফলে জনসচেতনতা সৃষ্টি হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে মিডিয়ার সক্রিয়তা অনেক সময় তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে সহায়তা করে। এ ছাড়া ভুক্তভোগীরা সামাজিক সমর্থন পান। মিডিয়া ট্রায়াল যেখানে বিচারাধীন ব্যক্তিকে আদালতের রায়ের আগেই অপরাধী বা নির্দোষ হিসেবে উপস্থাপন করে ন্যায়বিচার ব্যাহত করতে পারে, সেখানে দায়িত্বশীল গণমাধ্যম বিচারব্যবস্থাকে সহায়তা করতে পারে। এ ছাড়া গণমাধ্যম আদালতের গুরুত্বপূর্ণ রায় ও আইনগত বিষয় জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়ে আইনের শাসনের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি করতে পারে।

