কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে মরহুমা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ‘খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা’ নামে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু করেছিলেন। বিএনপি সরকার বর্তমানে ক্ষমতা গ্রহণের পর শিশুদের বিনামূল্যে খাবার দেওয়ার প্রশংসিত সেই সরকারি উদ্যোগ আবারও নতুনভাবে শুরু হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির পরিসর এবার আরও বাড়ানো হয়েছে।
১৯৯৩ সালে বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগ সফল হওয়ার পর ২০০১ সালে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সহায়তায় দেশে প্রথমবারের মতো স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালু হয়। যা ২০১০ সাল পর্যন্ত চলেছিল। পরে ২০২২ সাল পর্যন্ত দরিদ্রপীড়িত এলাকায় আরও একটি আলাদা স্কুল ফিডিং কর্মসূচি পরিচালিত হয়।
তবে অন্যান্য কার্যক্রমের মতো বিএনপি আমলে শুরু হওয়া এই উদ্যোগকে আওয়ামী লীগ সরকার গুরুত্ব দেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, স্কুল ফিডিং কর্মসূচির জাতীয় প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুন মাসে শেষ হওয়ার পর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সদিচ্ছার অভাবে দীর্ঘ সময় নতুন প্রকল্প চালু হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল।
বাংলাদেশে শিক্ষার প্রসার, অপুষ্টি হ্রাস এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে সরকার যে কয়েকটি সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তার মধ্যে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি অন্যতম সফল উদ্যোগ। এই কর্মসূচির মাধ্যমে হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতিদিন পুষ্টিকর খাদ্য পাচ্ছে। এর ফলে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বেড়েছে, ঝরে পড়ার হার কমেছে, শিশুদের পুষ্টির উন্নতি হয়েছে এবং শিক্ষার পরিবেশ আরও ইতিবাচক হয়েছে। এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
কিন্তু এই সফলতার মাঝেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে অনালোচিত রয়ে গেছেÑ যখন স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য ফিডিং কর্মসূচি রয়েছে, তখন দেশের লাখ লাখ মাদ্রাসা শিক্ষার্থী কেন এই সুবিধার বাইরে থাকবে?
এ প্রশ্ন কোনো বিশেষ শ্রেণির জন্য অতিরিক্ত সুবিধা চাওয়ার নয়; বরং শিক্ষায় সমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রনীতির প্রশ্ন।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বহুমাত্রিক। সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা এবং মাদ্রাসা শিক্ষাÑ এই তিনটি ধারা জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আলিয়া মাদ্রাসাগুলো সরকারি স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করেছে এবং সেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসহ জাতীয় শিক্ষাক্রমের বিষয়সমূহ পড়ানো হয়। অন্যদিকে কওমি মাদ্রাসাগুলোও দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষার কেন্দ্র এবং রাষ্ট্রও নির্দিষ্ট পর্যায়ে তাদের সনদের স্বীকৃতি দিয়েছে।
অথচ বাস্তবতা হলো, এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য রাষ্ট্র পরিচালিত কোনো পুষ্টি সহায়তা কর্মসূচি নেই। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দরিদ্র অঞ্চলের মাদ্রাসাগুলোতে অধ্যয়নরত বহু শিক্ষার্থী এমন পরিবার থেকে আসে, যাদের পক্ষে প্রতিদিন সুষম খাদ্যের ব্যবস্থা করা কঠিন। অনেক আবাসিক মাদ্রাসা সীমিত অনুদান ও দানের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের খাবারের মান সবসময় কাক্সিক্ষত হয় না। অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, শারীরিক দুর্বলতা এবং মনোযোগের ঘাটতি তাদের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আধুনিক গবেষণা বলছে, ক্ষুধার্ত বা অপুষ্ট শিশুর শেখার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পর্যাপ্ত পুষ্টি না থাকলে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এ কারণেই বিশ্বের বহু দেশ বিদ্যালয়ভিত্তিক খাদ্য কর্মসূচিকে শিক্ষা বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশও সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু করেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই বৈজ্ঞানিক সত্য কি শুধু স্কুল শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য? একজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মস্তিষ্ক কি ভিন্নভাবে কাজ করে? তার শরীরের পুষ্টির চাহিদা কি কম? নিশ্চয়ই নয়। একজন শিক্ষার্থী স্কুলে পড়ুক কিংবা মাদরাসায়Ñ তার পুষ্টির প্রয়োজন সমান। তাই রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক কর্মসূচিতেও সেই সমতা প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের সংবিধান সকল নাগরিকের সমান সুযোগ ও বৈষম্যহীনতার নীতি ঘোষণা করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতেও সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সমঅধিকারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুতরাং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বীকৃত একটি শিক্ষা ধারার শিক্ষার্থীদের বাইরে রাখা নীতিগতভাবে পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
কেউ কেউ বলতে পারেন, মাদ্রাসা ফিডিং চালু করলে সরকারের ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। কিন্তু এ যুক্তি আংশিক সত্য। কারণ অর্থনীতির ভাষায় শিশুর পুষ্টিতে ব্যয় কোনো ভোগব্যয় নয়; এটি মানবসম্পদে বিনিয়োগ। একজন সুপুষ্ট শিশু ভবিষ্যতে অধিক দক্ষ, সুস্থ ও উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে। অন্যদিকে অপুষ্ট শিশু চিকিৎসা ব্যয় বাড়ায়, শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ে এবং কর্মজীবনেও কাক্সিক্ষত অবদান রাখতে পারে না। তাই আজকের সামান্য বিনিয়োগ আগামী দিনের জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করে।
আরেকটি যুক্তি হলো, মাদ্রাসা তো দান-সদকা ও জনসাধারণের সহযোগিতায় চলে। কিন্তু দান কখনো রাষ্ট্রের নীতিগত দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না। শিক্ষা যদি রাষ্ট্র স্বীকৃত অধিকার হয়, তাহলে শিক্ষার্থীর ন্যূনতম পুষ্টিও রাষ্ট্রের বিবেচনার অংশ হওয়া উচিত। বিশেষ করে যখন একই ধরনের একটি কর্মসূচি ইতোমধ্যে দেশের অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য পরিচালিত হচ্ছে।
অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে, আগামীকাল থেকেই দেশের সব মাদ্রাসায় ফিডিং কর্মসূচি চালু করতে হবে। একটি বাস্তবসম্মত পথ হতে পারেÑ প্রথমে দরিদ্র, চর, হাওর, পাহাড়ি ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের সরকারি স্বীকৃত মাদ্রাসাগুলোতে পরীক্ষামূলকভাবে কর্মসূচি চালু করা। এরপর ফলাফল মূল্যায়ন করে ধাপে ধাপে এর পরিধি বাড়ানো যেতে পারে। এতে সরকারের ওপর এককালীন আর্থিক চাপও পড়বে না এবং বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতাও অর্জিত হবে।
খাদ্য তালিকাও জাঁকজমকপূর্ণ হওয়ার প্রয়োজন নেই। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডিম, দুধ, কলা, খেজুর, পুষ্টিকর বিস্কুট, খিচুড়ি বা অন্যান্য সহজলভ্য পুষ্টিকর খাদ্য দিয়েই কার্যকর কর্মসূচি পরিচালনা সম্ভব।
এতে একদিকে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে, অন্যদিকে স্থানীয় কৃষক ও উৎপাদকরাও লাভবান হবেন।
এ বিষয়টিকে কোনোভাবেই স্কুল বনাম মাদ্রাসার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি একটি শিক্ষা ধারার বিরুদ্ধে অন্য শিক্ষা ধারার দাবি নয়। বরং একটি সফল কল্যাণমূলক কর্মসূচির সুফল আরও বেশি সংখ্যক সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব। রাষ্ট্রের কাছে একজন স্কুল শিক্ষার্থী এবং একজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মূল্য সমান। তাদের ভবিষ্যৎও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। স্মার্ট বাংলাদেশ, টেকসই উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের যে লক্ষ্য সামনে নিয়ে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে কোনো শিক্ষার্থীকে অপুষ্টি বা বৈষম্যের কারণে পিছিয়ে রাখা উচিত নয়।
আজ যে শিশুটি একটি মাদ্রাসায় বসে কোরআন, হাদিস, বাংলা, ইংরেজি, গণিত বা বিজ্ঞান শিখছে, আগামীকাল সেই শিশুই একজন আলেম, শিক্ষক, বিচারক, গবেষক, প্রশাসক কিংবা সমাজনেতা হতে পারে। তার সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করা মানে দেশের ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করা।
তাই এখন সময় এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার। রাষ্ট্র কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দেখবে, নাকি শিক্ষার্থীকে? যদি উত্তর হয় ‘শিক্ষার্থী’, তবে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্যও একটি বাস্তবসম্মত, পর্যায়ক্রমিক ও টেকসই মাদ্রাসা ফিডিং কর্মসূচি চালুর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এসেছে। কারণ শিক্ষায় বৈষম্য দূর করা শুধু সংবিধানের অঙ্গীকার নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গঠনের অপরিহার্য শর্ত।
পরিশেষে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন যেন বিএনপি সরকারকে রাষ্ট্রের সর্বত্র ইনসাফ প্রতিষ্ঠার তৌফিক দান করেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন