× UCB Sticker Card
সোমবার, ০৬ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

সালমান ফরিদ, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক 

প্রকাশিত: জুলাই ৬, ২০২৬, ০৬:৫২ এএম

সরকারি কলেজের খণ্ডকালীন শিক্ষকদের মানবিক সংকট ও উত্তরণ

সালমান ফরিদ, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক 

প্রকাশিত: জুলাই ৬, ২০২৬, ০৬:৫২ এএম

সরকারি কলেজের খণ্ডকালীন শিক্ষকদের মানবিক সংকট ও উত্তরণ

একটি রাষ্ট্র বা সমাজ কতটা সভ্য, উন্নত ও মানবিক, তার আসল পরিমাপক লুকিয়ে থাকে সেই সমাজের মানুষ গড়ার কারিগরদের প্রতি আচরণের ওপর। শিক্ষা যদি একটি জাতির মেরুদ- হয়, তবে শিক্ষকরা হলেনÑ সেই মেরুদ-ের মূল সঞ্চালক এবং প্রাণশক্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার একটি বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে থাকা বেসরকারি থেকে সদ্য সরকারি হওয়া কলেজগুলোর খ-কালীন শিক্ষকদের জীবনচিত্রের দিকে তাকালে এক চরম অনিশ্চয়তা, অবহেলা, হতাশা আর অমানবিকতার চিত্র ফুটে ওঠে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের শতাধিক বেসরকারি কলেজকে জাতীয়করণ বা সরকারি করা হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পেছনে মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার মানোন্নয়ন ও প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সরকারি খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া। একই সঙ্গে অবহেলিত শিক্ষক সমাজও বুক বেঁধেছিলেন এক নতুন আশায়। প্রতিষ্ঠান সরকারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হয়তো তাদের ভাগ্যের চাকাও ঘুরবে, দূর হবে দীর্ঘদিনের আর্থিক অনটন।

কিন্তু বাস্তবতার জমিনে সেই আশা রূপ নিয়েছে এক চরম হতাশায়। নিয়মিত ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সরকারি কাঠামোর আওতায় চলে গেলেও, একরাশ শূন্যতা, বঞ্চনা আর চরম বৈষম্য নিয়ে পেছনে পড়ে রইলেন শত শত খ-কালীন ও নন-এমপিও শিক্ষক। এই শিক্ষকদের সিংহভাগই জীবনের সোনালি সময়টা পার করেছেন কলেজের ক্লাসরুমে, নামমাত্র সম্মানি বা অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিনা বেতনে। কেবল প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের প্রতি ভালোবাসা এবং ভবিষ্যতে চাকরি নিয়মিত হওয়ার আশায় তারা বছরের পর বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে পাঠদান করে গেছেন। শিক্ষাকার্ক্রম বা শিক্ষক সংকটে শ্রেণি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখায় তাদের অবদান অনস্বীকার্য। বিগত সরকার নিয়মিত শিক্ষকদের আত্তীকরণ ও সরকারি করণের দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক ও আইনি প্রক্রিয়া শেষ করতেই তাদের পুরো মেয়াদ পার করে ফেলে। কোথাও কোথাও খ-কালীন শিক্ষকদের আত্তীকরণের মৌখিক বা নীতিগত আশ্বাস দেওয়া হলেও, শেষ পর্যন্ত তা ফাইলের স্তূপে বন্দি থেকে যায়। তারা কিছুই করে যেতে পারেনি।

এরপর সময়ের আবর্তনে দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটে এবং বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসে। দেশের আপামর জনতা এবং বিশেষ করে এই বঞ্চিত শিক্ষক সমাজ আশা করেছিলেন, সুশাসন, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার নতুন অধ্যায়ে এবার হয়তো তাদের দীর্ঘদিনের ত্যাগের সঠিক মূল্যায়ন হবে। মানবিক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাদের মূল্যায়ন করবেন। আশার আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়াবেন তিনি। 

কিন্তু শিক্ষকদের এই ন্যায্য পাওনা বা মূল্যায়ন দিতে পা না বাড়িয়ে বর্তমান সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় একে আরও জটিল ও সংকটাপন্ন করে তুলেছে। শিক্ষামন্ত্রী ও মন্ত্রণালয় ‘পরীক্ষা ছাড়া আর কোনো শিক্ষক নিয়োগ নয়Ñ এমন একটি অনমনীয়, কঠোর ও তথাকথিত ‘মেধাভিত্তিক’ অবস্থান গ্রহণ করেছে। এই অবস্থানটি নীতিমালার চশমায় দেখতে যতই সুন্দর লাগুক না কেন, বাস্তবতার রূঢ় জমিনে তা চরম অমানবিক, অযৌক্তিক এবং প্রজ্ঞাহীন সিদ্ধান্ত।

এই কঠোর অবস্থানের কারণে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে শিক্ষকদের বয়সের জায়গায়। যে শিক্ষকরা সরকারি হওয়ার আশায় জীবনের অর্ধেকটা সময় পার করে দিয়েছেন, তাদের অনেকের বয়স এখন ৪০, ৪৫ কিংবা তারও বেশি। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সাধারণ বয়সসীমা তারা বহু আগেই পার করে এসেছেন। যে বয়সে একজন মানুষের কর্মজীবন গুছিয়ে নেওয়ার কথা, পরিবার ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার কথা, সেই বয়সে এসে তাদের ভয় দেখানো হচ্ছে নতুন করে প্রিলিমিনারি, লিখিত কিংবা ভাইভা পরীক্ষার টেবিলে বসতে! এটি শুধু অবাস্তব নয়, চরম হীনম্মন্যতার বহির্প্রকাশ। এই বয়সে এসে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে নিয়োগ পাওয়ার মতো মানসিক পরিস্থিতি, বয়সজনিত হিশেব ও শারীরিক সক্ষমতা কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার মতো মানসিকতাÑ কোনোটিই তাদের অনুকূলে নেই।

উত্তরণের উপায় কী

তবে এই জটিল ও অমানবিক সংকট থেকে উত্তরণের পথ কিন্তু একেবারেই রুদ্ধ হয়ে যায়নি। রাষ্ট্র যদি আন্তরিক হয় এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ঊর্ধ্বে উঠে বিষয়টি বিবেচনা করে, তবে আইনি ও প্রশাসনিক উভয় দিক থেকেই একটি সুন্দর ও টেকসই সমাধান সম্ভব। প্রথমত, উত্তরণের সবচেয়ে বড় এবং আইনি পথটি মহামান্য হাইকোর্ট নিজেই তৈরি করে দিয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত সুপ্রিম কোর্টে আপিল বা দীর্ঘমেয়াদি আইনি লড়াইয়ের পথে না হেঁটে হাইকোর্টের রায়কে নিঃশর্তে মেনে নেওয়া এবং আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সাভার ও মদন মোহন কলেজসহ সকল ভুক্তভোগী কলেজের শিক্ষকদের সরাসরি পদায়ন বা আত্তীকরণ করা, যা আইনি ও প্রশাসনিক উভয় সংকটেরই তাৎক্ষণিক অবসান ঘটাবে। দ্বিতীয়ত, সরকার যখন নীতিগতভাবে ‘পরীক্ষা ছাড়া কোনো নিয়োগ নয়’ অবস্থানে অনড় থাকতে চায়, তখন এই বিশেষ পরিস্থিতিকে সাধারণ নিয়মের বাইরে রেখে একটি ‘বিশেষ অধ্যাদেশ’ বা নির্বাহী আদেশ জারি করা যেতে পারে। যেহেতু এই শিক্ষকরা ২০১৮ সাল বা তার আগে থেকে কর্মরত ছিলেন এবং তাদের বয়স এখন ৪০ বা ৪৫ বছর, তাই তাদের বিষয়টিকে একটি অনন্য ও বিশেষ মানবিক মামলা হিসেবে গণ্য করে সরাসরি নিয়মিতকরণের গেজেট প্রকাশ করা সম্পূর্ণ আইনসম্মত।

যদি মন্ত্রণালয় একেবারেই পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে, তবে উত্তরণের স্বার্থে এই বিশেষ ব্যাচের জন্য পরীক্ষার ধরন পরিবর্তন করা অপরিহার্য। ৪০ বা ৪৫ বছর বয়সি একজন অভিজ্ঞ শিক্ষককে তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে প্রিলিমিনারি বা সাধারণ জ্ঞানের প্রতিযোগিতায় নামানো কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। এর পরিবর্তে তাদের জন্য কেবল একটি যোগ্যতা মূল্যায়ন সাক্ষাৎকার অথবা তাদের বিগত ১০-১৫ বছরের শিক্ষকতার ট্র্যাক রেকর্ড ও পারফরম্যান্স মূল্যায়নকে পরীক্ষা হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। একই সঙ্গে, এই শিক্ষকদের যেহেতু নিয়মতান্ত্রিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার গ্যাঁড়াকলে পড়ে বয়স পার হয়ে গেছে, তাই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা তাদের জন্য সম্পূর্ণ শিথিল করতে হবে এবং তাদের চাকরির বয়স ও অভিজ্ঞতাকে গণনা করে ব্যাক-ডেটেড বা রেট্রোস্পেক্টিভ সুবিধা দিয়ে চাকরিতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যেন তারা অবসরের সময় পেনশনের আওতাভুক্ত হতে পারেন। সর্বোপরি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বুঝতে হবে যে সুশাসন বা সংস্কারের অর্থ কেবল কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং নিয়মের ভেতরে মানবিকতার চর্চা করা। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের উচিত খ-কালীন শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সরাসরি টেবিলে বসা, তাদের দুর্দশা স্বচক্ষে দেখা এবং আমলাদের তৈরি করা একপেশে ফাইলের বাইরে এসে রাজনৈতিক ও মানবিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়া।

শিক্ষা যেখানে একটি জাতির মেরুদ-, সেখানে শিক্ষকদের মাথার মুকুট করে রাখার কথা। কিন্তু তাদের অনিশ্চিত ও যাযাবর জীবনে ঠেলে দেওয়ার এই সংকীর্ণ মানসিকতা কতটা উদার, কতটা মানবিক এবং সুশাসনের কোন সংজ্ঞায় পড়ে, তা নিয়ে আজ সচেতন মহলে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মেধা ও নীতিমালার দোহাই দিয়ে যদি মানবিকতা এবং বাস্তব কা-জ্ঞান হারিয়ে যায়, তবে সেই সুশাসন ও সংস্কার অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই ৪০-৪৫ বছর বয়সি শিক্ষকদের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এবং শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা অর্জনের ক্ষমতাই হওয়া উচিত তাদের সবচেয়ে বড় ‘পরীক্ষা’ ও ‘যোগ্যতা’। বর্তমান সরকারের উচিত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অনমনীয় অবস্থান ভেঙে, আদালতের রায়ের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এবং সর্বোপরি মানবিক ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই খ-কালীন শিক্ষকদের নিয়মিতকরণের ব্যবস্থা করা। শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান ও সামাজিক নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেওয়া কোনো দয়া বা দান নয়, এটি এই রাষ্ট্রের আত্মশুদ্ধি এবং বেঁচে থাকার এক পরম নৈতিক দায়িত্ব।
 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!