ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২৬

সম্পাদকীয়

বিদ্যুৎ বিলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হোক

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০২৬, ০৭:২২ এএম

বিদ্যুৎ মানুষের নিত্যদিনের মৌলিক প্রয়োজনীয় সেবাগুলোর একটি। আধুনিক জীবনের প্রায় প্রতিটি কর্মকা-ই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। তাই এই খাতের সেবায় স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে প্রতি বছর জুন মাস এলেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ যেন নিয়মিত এক বাস্তবতায় পরিণত হয়। এবারও রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের কাছ থেকে অস্বাভাবিক হারে বিদ্যুৎ বিল আসার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে প্রিপেইড মিটারে প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে হাজার হাজার গ্রাহককে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই একটি জনসেবামুখী রাষ্ট্রের জন্য কাম্য হতে পারে না।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ট্যারিফ সমন্বয়, বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ বৃদ্ধি, উচ্চতর স্ল্যাবে চলে যাওয়া কিংবা কিছু করণিক ভুলের কারণেই বিল বেড়েছে। আবার প্রিপেইড মিটারের দীর্ঘ ডিজিট কোডের সমস্যাকে প্রযুক্তিগত ত্রুটি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এসব ব্যাখ্যার কিছু বাস্তবতা থাকলেও প্রশ্ন হলো, যদি একই ধরনের সমস্যা প্রায় প্রতি বছরই ঘটে, তবে তা প্রতিরোধে আগাম কার্যকর ব্যবস্থা কেন নেওয়া হয় না? প্রযুক্তিগত ত্রুটি একবার হতে পারে, কিন্তু সেটি যদি নিয়মিত পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে সেটি আর কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যা থাকে না; তা হয়ে ওঠে ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ করেও অধিকাংশ গ্রাহক সময়মতো প্রতিকার পান না। অনেককে প্রথমে বাড়তি বিল পরিশোধ করতে হয়, পরে সমন্বয়ের আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু বিল সমন্বয় হলেও অতিরিক্ত ইউনিটের কারণে যদি কোনো গ্রাহক উচ্চতর স্ল্যাবে চলে যান, সেই অতিরিক্ত অর্থ আর ফেরত পাওয়া যায় না। ফলে বাস্তবে ক্ষতির ভার বহন করেন সাধারণ গ্রাহকরাই। এটি কোনোভাবেই ন্যায়সংগত হতে পারে না।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে শুধু আশ্বাস দিলেই চলবে না, দৃশ্যমান সংস্কার কার্যক্রম শুরু করতে হবে। প্রতিটি মিটার রিডিংয়ের সঙ্গে ডিজিটাল ছবি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত, যাতে পরবর্তীতে কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে তা সহজেই যাচাই করা যায়।

একই সঙ্গে সিস্টেম লসের বিষয়েও সরকারের আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। যদি কোথাও বিদ্যুৎ চুরি, অবৈধ সংযোগ, দুর্বল অবকাঠামো বা ব্যবস্থাপনার কারণে ক্ষতি হয়, তার দায় কোনোভাবেই সাধারণ গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। সিস্টেম লস কমানোর নামে কিংবা রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত বিল করার অভিযোগ যদি কোথাও সত্য হয়ে থাকে, তবে তার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে যেমন অনিয়ম কমবে, তেমনি বিদ্যুৎ খাতের প্রতি জনগণের আস্থাও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

বিদ্যুৎ খাতে অতীতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার দায় বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে, এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু জনগণ অতীতের ব্যাখ্যা নয়, বর্তমানের কার্যকর সমাধান দেখতে চায়। একটি দায়িত্বশীল সরকার হিসেবে তাদের প্রধান দায়িত্ব হবে গ্রাহকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং এমন একটি বিলিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো গ্রাহক অযৌক্তিক বিলের শিকার হবেন না।

বিদ্যুৎ সেবা একটি নাগরিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বিলিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, কঠোর জবাবদিহি এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতেই হবে। কারণ ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিল শুধু অতিরিক্ত অর্থের বোঝা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতি মানুষের বিশ্বাস ক্ষয়েরও অন্যতম কারণ। সেই বিশ্বাস পুনর্গঠনই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।