ছয় ঋতুর এই দেশে বর্ষা মানেই প্রাণের সঞ্চার, নদীর উচ্ছ্বাস, কৃষকের হাসি। ‘আষাঢ়ে বৃষ্টি, কৃষকের কৃষ্টি’ এই প্রবাদটি কেবল একটি কথার ফুলঝুরি নয়, বরং আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনের গভীর বাস্তবতার প্রতিফলন। কিন্তু সেই বৃষ্টি যখন ভয়াবহ রূপ নেয়, যখন তা বন্যা, পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন জাগে, এটি কি শুধুই প্রকৃতির খেয়াল, নাকি আমাদের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও ভুল নীতির ফল।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা ভারি বৃষ্টি, চার বিভাগে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ধস, রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা, এসব ঘটনা যেন একসঙ্গে আমাদের সামনে এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এই বাস্তবতা নতুন নয়, বরং প্রতি বছরই আমরা এর পুনরাবৃত্তি দেখি। তবু আমরা প্রস্তুত হই না, শিখি না, বদলাই না।
প্রকৃতি তার নিয়মে চলে, আমরা কি প্রস্তুত? বাংলাদেশ একটি ব-দ্বীপ অঞ্চলÑ গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার মিলিত স্রোত আর বঙ্গোপসাগরের উত্তাল তরঙ্গে গড়ে ওঠা এই ভূখ-ে বন্যা একটি স্বাভাবিক ঘটনা। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে মৌসুমি বন্যা ছিল এবং মানুষ সেই অনুযায়ী জীবনযাত্রা গড়ে তুলেছিল। উঁচু ভিটা, নৌকাভিত্তিক যোগাযোগ, ফসলের মৌসুম নির্ধারণ, সবকিছুই ছিল প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিন্তু আধুনিক নগরায়ণ ও উন্নয়নের নামে আমরা সেই সামঞ্জস্য ভেঙে ফেলেছি। নদী দখল, খাল ভরাট, জলাধার ধ্বংস, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, এসবের ফলে প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অতীতে খাল নিধন ও নদীকে অবজ্ঞা করার যে ভুল নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, তা ছিল আমাদের জন্য এক মারাত্মক ভুল। এর ফলে নদী তার নাব্য হারিয়েছে, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং স্থলের বিভিন্ন স্থানে দলবদ্ধ ও স্থবির জলজট সৃষ্টি হয়েছে। ‘নদী তার পথ খুঁজে নেয়’Ñ এই প্রবাদটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমরা নদীর পথ বন্ধ করেছি, এখন পানি আমাদের ঘরে ঢুকে তার পথ খুঁজছে। এটি কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের ভুলের স্বাভাবিক পরিণতি।
বর্তমান সরকার তথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী পরিকল্পনা ও খাল খনন কর্মসূচি এই জলাবদ্ধতার সংকট দূরীকরণে একটি মাইলফলক হতে পারে। পরিকল্পিতভাবে খালগুলো পুনর্খনন এবং নদীগুলোর নাব্য পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে কেবল জলাবদ্ধতাই দূর হবে না, বরং এটি আমাদের জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো বিনির্মাণে সহায়ক হবে। যখন শহরের ভেতরকার খালগুলো তার পুরোনো প্রবাহ ফিরে পাবে, তখন অতিবৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য আর কৃত্রিম সংকটের মুখে পড়তে হবে না। এই উদ্যোগগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি এবং টেকসই উন্নয়নের অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করলে, আমাদের শহরগুলো ভবিষ্যতে ‘স্পঞ্জ সিটি’ হিসেবে গড়ে উঠতে সক্ষম হবে, যা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
পাহাড়ি বিপর্যয় কি শুধুই প্রকৃতির বা মানুষের সৃষ্টি? চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ধসের ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত। প্রতি বছরই আমরা দেখিÑ বৃষ্টি হলেই পাহাড়ধসে মানুষ মারা যাচ্ছে, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু কয়েক দশক আগে এই সমস্যা এত তীব্র ছিল না। কারণ তখন পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য অক্ষুণœ ছিল। এখন আমরা নির্বিচারে পাহাড় কাটছি, গাছপালা ধ্বংস করছি, অপরিকল্পিত বসতি গড়ে তুলছি। ফলে মাটি দুর্বল হয়ে পড়ছে, আর বৃষ্টির পানিতে তা সহজেই ধসে যাচ্ছে।
‘যে ডাল কাটে, সে-ই পড়ে’Ñ এই কথাটির বাস্তব প্রতিফলন আমরা এখানে দেখি। আমরা নিজেরাই পাহাড়ের ভিত্তি দুর্বল করছি, তারপর সেই পাহাড় ধসে আমাদের ওপরই পড়ছে। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতেও একই সমস্যা। অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য বসতি গড়ে তুলতে গিয়ে পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে, বন উজাড় করা হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই সেখানে ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এটি শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি মানবিক সংকট। উন্নয়নের নামে ইকো-সিস্টেম সার্ভিস নষ্ট করার যে খেসারত আমরা দিচ্ছি, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কংক্রিটের জঙ্গলে পানি শোষণ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা নিরসনে আমাদের কঠোর হতে হবে।
আমাদের উন্নয়ন দর্শন এখন মূলত অবকাঠামোকেন্দ্রিক। আমরা তথাকথিত আধুনিকতার পেছনে ছুটতে গিয়ে পরিবেশগত খরচ বা ‘এনভায়রনমেন্টাল কস্ট’-এর বিষয়টি ভুলে গেছি। অথচ একটি টেকসই নগরায়ণের জন্য প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ ইকো-সিস্টেম। যখন আমরা অপরিকল্পিতভাবে বড় বড় কংক্রিটের স্থাপনা তৈরি করি, তখন আমরা মাটির পানি শোষণ ক্ষমতা বা ‘ইনফ্লট্রেশন ক্যাপাসিটি’ কমিয়ে ফেলি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি দ্রুত রাস্তা ও ড্রেনে নেমে আসে, যা জলাবদ্ধতাকে তীব্র করে তোলে। এই কংক্রিটের জঙ্গল প্রকৃতির স্বাভাবিক জলচক্রকে ব্যাহত করছে, যার মাশুল দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। আমাদের বুঝতে হবে, যে উন্নয়ন প্রকৃতির অস্তিত্বকে বিপন্ন করে, তা কোনোভাবেই টেকসই নয়।
প্রকৃতি আমাদের ফ্রিতে যে সুবিধাগুলো দেয়, যেমনÑ গাছপালা কার্বন শোষণ করে, জলাভূমি পানি ধরে রাখে এবং পাহাড় মাটিকে ধরে রাখে। আমরা যখন উন্নয়নের নামে এই সার্ভিসগুলো নষ্ট করি, তখন কৃত্রিম উপায়ে সেগুলো পুনরুদ্ধারে আমাদের বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা খরচ করতে হয়। ড্রেনেজ ব্যবস্থার বিপর্যয় বা জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রতি বছর যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তা যদি আমরা আমাদের নদ-নদী ও জলাশয়গুলোকে রক্ষা করতে বিনিয়োগ করতাম, তবে পরিস্থিতি আজকের তুলনায় অনেক ভালো হতো। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে প্রকৃতিকে জয় করার চেষ্টা কেবল অর্থেরই অপচয় নয়, এটি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের জন্য এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে, আবহাওয়া অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন। কিন্তু তাদের মধ্যে কার্যকর আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। আবহাওয়া অধিদপ্তর আগাম সতর্কতা দেয়, কিন্তু সেই তথ্য সব মানুষের কাছে পৌঁছায় না। স্থানীয় প্রশাসন অনেক সময় প্রস্তুত থাকে না। ফলে সতর্কতা থাকলেও ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায় না।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য হলেও, এর ভয়াবহ প্রভাবের শিকার আমরাই সবচেয়ে বেশি। এই সংকটের বিপরীতে আমাদের করণীয় হলোÑ নিজস্ব সক্ষমতা ও উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা এবং নাগরিক সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। শিল্প-কারখানাগুলোর ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নদীর পানি আরও বিষাক্ত না হয়।
প্রতিটি দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি¤œআয়ের মানুষ। দিনমজুর, রিকশাচালক, কৃষকÑ তাদের জীবন সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টি হলে তারা কাজ করতে পারে না, আয় বন্ধ হয়ে যায়। বন্যা হলে ফসল নষ্ট হয়, ঘরবাড়ি ভেঙে যায়। ‘ধনী হারায় টাকা, গরিব হারায় জীবন’Ñ এই প্রবাদটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শহরের মানুষ কিছুটা কষ্ট পেলেও তারা দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে, কিন্তু দরিদ্র মানুষের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের চক্রে আটকা পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে দুর্যোগ-সহনশীল করতে হবে, যাতে দুর্যোগের দিনেও তাদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অবলম্বনটুকু অক্ষুণœ থাকে।
প্রযুক্তির পাশাপাশি আমাদেও ‘দেশীয় জ্ঞান’ বা ‘ইন্ডিজেনাস নলেজ’কে গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের পূর্বপুরুষরা কীভাবে বন্যার সময় উঁচু স্থানে বসতি করত বা কী ধরনের ফসল বন্যার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারতÑ এই ঐতিহ্যগত জ্ঞানগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করা এখন সময়ের দাবি।
বলতে গেলে সমস্যা আমরা জানি, এখন প্রয়োজন কঠোর রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বাস্তব পদক্ষেপ। প্রথমত, দেশের প্রতিটি শহরের সংযোগকারী খাল ও নদীগুলোকে দখলমুক্ত করে খনন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেওয়া খাল খননের এই দূরদর্শী পরিকল্পনাকে মাঠ পর্যায়ে দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শহরগুলোকে ‘স্পঞ্জ সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে পর্যাপ্ত জলাধার ও উন্মুক্ত মাটি বৃষ্টির পানি শোষণ করতে পারবে।
এখন সিদ্ধান্ত আমাদেরÑ আমরা কি আগের মতোই ভুল করে যাব, নাকি শিক্ষা নিয়ে পরিবর্তনের পথে হাঁটব। আজকের পাহাড়ধস এবং সমুদ্রের এটি ভবিষ্যতের এক কঠিন সংকেত। যদি আমরা এখনই জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন নীতি গ্রহণ না করি, তা হলে আগামী দিনের দুর্যোগ হবে আরও ভয়াবহ, আরও নির্মম। মনে রাখতে হবে, প্রকৃতি আমাদের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং আমরা প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাই এখন আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র গ্যারান্টি। সময়ের এই ডাকে সাড়া দেওয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। যদি এখনই না জাগি, তা হলে আগামী দিনের দুর্যোগ আমাদের জন্য হবে অসহনীয়। আসুন, আমরা সচেতন হই, প্রকৃতিকে ভালোবাসি এবং একটি টেকসই বাংলাদেশ গড়ি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন