× UCB Sticker Card
সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

প্রফেসর ড. মো. আবু তালেব

প্রকাশিত: জুলাই ২৭, ২০২৬, ০২:৫০ এএম

কৃষিই হতে পারে রপ্তানির নতুন শক্তি

প্রফেসর ড. মো. আবু তালেব

প্রকাশিত: জুলাই ২৭, ২০২৬, ০২:৫০ এএম

কৃষিই হতে পারে রপ্তানির নতুন শক্তি

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকশিল্প। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে এই এক খাত থেকেই। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অর্থবছরগুলোতে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ সাফল্য নিঃসন্দেহে গর্বের। কিন্তু একটি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্ববাজারে চাহিদা কমলে বা কোনো বৈশ্বিক সংকট দেখা দিলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে। তাই এখন সময় এসেছে নতুন রপ্তানি খাত গড়ে তোলার। আর সেই সম্ভাবনাময় খাত হতে পারে কৃষি।

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের মাটি উর্বর। আবহাওয়া অনুকূল। সারা বছর নানা ধরনের ফসল উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। ধান, সবজি, ফল, মসলা, চা, পাট, মাছ, চিংড়ি, আলু ও ফুলÑ প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু দেশের চাহিদা পূরণ নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ৪ কোটির বেশি টন ধান উৎপাদিত হয়। সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, লিচু, কলা ও আনারস উৎপাদনেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। এত উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কৃষিপণ্যের রপ্তানিতে আমাদের অবস্থান এখনো আশানুরূপ নয়।

বিশ্বের কৃষিপণ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য, জৈব কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং উচ্চমূল্যের ফল ও সবজির চাহিদা বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের বড় বাজার রয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কারণে দেশীয় ফল, সবজি ও মসলার চাহিদা প্রতি বছর বাড়ছে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আম, কাঁঠাল, সবজি, আলু, চা, হিমায়িত মাছ এবং চিংড়ি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাজা আম, কাঁঠাল ও সবজি রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে। এটি ইতিবাচক লক্ষণ। তবে সম্ভাবনার তুলনায় এই অগ্রগতি এখনো অনেক কম।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মান নিয়ন্ত্রণ। আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য কঠোর মানদ- মানতে হয়। কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, স্বাস্থ্যবিধি, প্যাকেজিং এবং ট্রেসেবিলিটির বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় আমাদের কৃষিপণ্য এসব মান পূরণ করতে না পারায় বিদেশি বাজারে বাধার মুখে পড়ে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রক্রিয়াজাতকরণের ঘাটতি। বাংলাদেশে এখনও উৎপাদিত কৃষিপণ্যের একটি বড় অংশ কাঁচা অবস্থায় বিক্রি হয়। ফলে কৃষক কম দাম পান। অন্যদিকে উন্নত দেশগুলো একই কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে কয়েক গুণ বেশি দামে রপ্তানি করে। আম থেকে জুস, শুকনো আম, জ্যাম ও পিউরি তৈরি করা যায়। টমেটো থেকে সস তৈরি করা যায়। আলু থেকে চিপস ও স্টার্চ উৎপাদন করা যায়। মসলা থেকে মূল্য সংযোজন করা যায়। এই শিল্পগুলো যত বাড়বে, রপ্তানি আয়ও তত বাড়বে।

সংরক্ষণ ব্যবস্থাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ফল ও সবজি সংগ্রহের পর নষ্ট হয়ে যায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, অনেক কৃষিপণ্যের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সংগ্রহ-পরবর্তী পর্যায়ে অপচয় হয়। পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ, আধুনিক গুদাম এবং দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে এই ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব।

কৃষিপণ্য রপ্তানিতে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়াতে হবে। আধুনিক প্যাকেজিং, মান পরীক্ষার ল্যাবরেটরি, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এবং আন্তর্জাতিক সনদ অর্জনে বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজার সম্পর্কে কৃষক ও উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

তরুণদের কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলাও সময়ের দাবি। বর্তমানে অনেক শিক্ষিত তরুণ নিরাপদ সবজি, ফল, মধু, মসলা, অর্গানিক খাদ্য এবং কৃষিপণ্য অনলাইনে বিক্রি করছেন। অনেকেই বিদেশেও রপ্তানি শুরু করেছেন। এই উদ্যোগগুলোকে সরকারি সহায়তা দিতে হবে। সহজ ঋণ, রপ্তানি প্রণোদনা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে।

সরকার ইতোমধ্যে কৃষি আধুনিকায়ন, কৃষিযান্ত্রিকীকরণ এবং কৃষিপণ্য রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে মাঠপর্যায়ে এসব উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কৃষক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, রপ্তানিকারক এবং সরকারের মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করতে হবে।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের একটি বড় শক্তি হতে পারে নিরাপদ ও বিষমুক্ত কৃষিপণ্য। বর্তমানে অনেক দেশ জৈব ও নিরাপদ খাদ্যের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন করতে পারে, তাহলে এই বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে, অন্যদিকে দেশের কৃষকও ন্যায্যমূল্য পাবেন।

কৃষিপণ্য রপ্তানি বাড়লে শুধু অর্থনীতি নয়, কর্মসংস্থানও বাড়বে। নতুন নতুন কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠবে। গ্রামে বিনিয়োগ বাড়বে। কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে। বৈদেশিক মুদ্রার নতুন উৎস তৈরি হবে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও কমবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি বড় সুযোগ রয়েছে। বিশ্বে নিরাপদ খাদ্যের বাজার বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক দেশে কৃষি উৎপাদন কমছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে আন্তর্জাতিক কৃষিপণ্যের বাজারে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।

তাই এখন সময় কৃষিকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত হিসেবে নয়, রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে দেখার। গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কৃষিপণ্যের মান উন্নত করতে হবে। প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্প্রসারণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কৃষক ও উদ্যোক্তাদের রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির আগামী অধ্যায় শুধু পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভর করবে না। কৃষিও হতে পারে সেই নতুন শক্তি, যা দেশের রপ্তানি আয় বাড়াবে, লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এখন প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং কৃষিকে রপ্তানির জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

অধ্যাপক (কৃষি) ও সাবেক ডিন,  কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন অনুষদ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!