ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

অভিবাসীদের সংগ্রাম ও অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা

আশরাফুল ইসলাম হাসিব
প্রকাশিত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, ০৬:৪০ এএম

আন্তর্জাতিক অভিবাসন বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রতি বছর লাখ লাখ বাংলাদেশি উন্নত কর্মসংস্থান, উচ্চ আয় এবং উন্নত জীবনযাত্রার আশায় বিদেশে পাড়ি জমান। তবে প্রবাস জীবনের শুরুটা সাধারণত সহজ নয়; ভাষাগত সমস্যা, আর্থিক ঋণ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং কর্মক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, সীমিত কর্মসংস্থান এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনেক বাংলাদেশিকে বিদেশে কাজের সন্ধানে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঙৎমধহরুধঃরড়হ ভড়ৎ গরমৎধঃরড়হ-এর তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী বসবাস বা কর্মরত রয়েছেন।

বাংলাদেশি অভিবাসনের প্রধান গন্তব্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা। বিশেষভাবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইতালি এবং টহরঃবফ করহমফড়স বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশি অভিবাসনের কারণ

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অভিবাসনের প্রধান কারণ অর্থনৈতিক। দেশের ভেতরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকেই বিদেশে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন।

ডড়ৎষফ ইধহশ-এর মতে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।  অভিবাসনের প্রধান কারণগুলো হলো-  উচ্চ আয়ের সুযোগ,  দেশের ভেতরে বেকারত্ব বা আংশিক কর্মসংস্থান, উন্নত জীবনযাত্রার আকাক্সক্ষা, বৈশ্বিক শ্রমবাজারে শ্রমিকের চাহিদা, সামাজিক নেটওয়ার্ক বা আত্মীয়স্বজনের প্রভাব।

প্রবাস জীবনের প্রাথমিক সংগ্রাম

বিদেশে যাওয়ার পর প্রথম যে সমস্যাটি অনেক বাংলাদেশি অভিবাসীকে মোকাবিলা করতে হয় তা হলো ভাষাগত বাধা। বিদেশে যাওয়ার জন্য অনেক সময় বড় অঙ্কের টাকা খরচ করতে হয়। অনেক অভিবাসী ঋণ নিয়ে বা জমি বিক্রি করে বিদেশে যান। ফলে প্রবাস জীবনের প্রথম কয়েক বছর তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে সেই ঋণ পরিশোধ করা। এই বিষয়ে শ্রমিক অধিকার রক্ষায় কাজ করছে ওহঃবৎহধঃরড়হধষ খধনড়ঁৎ ঙৎমধহরুধঃরড়হ। নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতি এবং পরিবারের থেকে দূরে থাকার কারণে অনেক অভিবাসী মানসিক চাপ বা একাকিত্ব অনুভব করেন। প্রবাস জীবনের শুরুতে এই মানসিক চ্যালেঞ্জ বেশ প্রবল হতে পারে।

বাংলাদেশি অভিবাসীদের কর্মসংস্থান

বাংলাদেশি অভিবাসীরা সাধারণত নি¤œ ও মধ্য দক্ষতার বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত থাকেন। মধ্যপ্রাচ্যে; নির্মাণ শ্রমিক, গৃহকর্মী, ড্রাইভার, নিরাপত্তাকর্মী, পরিষেবা কর্মী।

ইউরোপ ও পশ্চিমা দেশে রেস্টুরেন্ট কর্মী, শেফ বা রান্না পেশা, ডেলিভারি ড্রাইভার, দোকান বা ব্যবসা, কেয়ার ও সাপোর্ট সেবা।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক অভিবাসী নতুন দক্ষতা অর্জন করেন এবং ভালো আয়ের চাকরি বা নিজস্ব ব্যবসা শুরু করেন।

অভিযোজন ও টিকে থাকার কৌশল

প্রবাস জীবনের শুরুতে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হলেও ধীরে ধীরে অভিবাসীরা নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেন।

সামাজিক নেটওয়ার্ক

বাংলাদেশি কমিউনিটি, মসজিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বন্ধুবান্ধব অভিবাসীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। স্থানীয় ভাষা শেখার মাধ্যমে অভিবাসীরা কর্মক্ষেত্রে উন্নতি করতে পারেন এবং সমাজে সহজে মিশে যেতে পারেন। অনেক অভিবাসী বিদেশে কাজ করার সময় নতুন দক্ষতা অর্জন করেন যেমনÑ  ইলেকট্রিক কাজ, নির্মাণ প্রযুক্তি, রান্না, ড্রাইভিং এই দক্ষতাগুলো তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতার মানসিক প্রভাব

প্রবাস জীবনের একটি বড় দিক হলো পরিবারের থেকে দীর্ঘ সময় দূরে থাকা। অনেক অভিবাসী বছরের পর বছর স্ত্রী, সন্তান এবং বাবা-মায়ের থেকে দূরে থাকেন। তবে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন ভিডিও কল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইত্যাদি এই দূরত্ব কিছুটা কমিয়ে দেয়। তবুও পরিবারকে মিস করা অভিবাসী জীবনের একটি বাস্তবতা।

স্থায়ী বসবাসের সম্ভাবনা

স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ বিভিন্ন দেশের নীতির ওপর নির্ভর করে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে শ্রমিকরা অস্থায়ী ভিসায় কাজ করেন এবং স্থায়ী বসবাসের সুযোগ সীমিত। অন্যদিকে ইউরোপ বা পশ্চিমা দেশে দীর্ঘ সময় বৈধভাবে বসবাস করলে স্থায়ী বসবাস বা নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ টহরঃবফ করহমফড়স-এ সাধারণত পাঁচ বছর বৈধভাবে বসবাসের পর স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করা যায়।

রাজনৈতিক আশ্রয় ও শরণার্থী আবেদন

কিছু বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশে রাজনৈতিক বা সামাজিক কারণে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। এই প্রক্রিয়াটি জটিল এবং দীর্ঘ সময় নিতে পারে।

এ ধরনের শরণার্থী ও আশ্রয় আবেদন সংক্রান্ত বিষয়গুলো আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষণ করে টহরঃবফ ঘধঃরড়হং ঐরময ঈড়সসরংংরড়হবৎ ভড়ৎ জবভঁমববং।

প্রবাসে সামাজিক জীবন ও অবসর

অভিবাসীরা কাজের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনও গড়ে তোলেন। তাদের সাধারণ অবসর কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে; পর্যটন স্থানে ভ্রমণ, ধর্মীয় উৎসব উদযাপন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা ও সামাজিক আড্ডা। এগুলো তাদের মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

রেমিট্যান্স ও অর্থনৈতিক অবদান

বাংলাদেশি অভিবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তারা বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠান যা রেমিট্যান্স নামে পরিচিত।  ডড়ৎষফ ইধহশ-এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশ।  এই অর্থ সাধারণত ব্যবহৃত হয় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাড়ি নির্মাণ, ব্যবসায় বিনিয়োগ।

লেখক : লন্ডন প্রবাসী