সরকারি ক্যালেন্ডারের হিসাব বদলেছে, তাই এ বছর আজ পহেলা ফাল্গুন নয়। সরকারি হিসেবে আগামীকাল পহেলা ফাল্গুন। কিন্তু ক্যালেন্ডারের তারিখ যাই বলুক, প্রকৃতি তো নিজের নিয়মেই চলে। চারদিকে ফুল ফুটেছে, গাছে গাছে রঙের উৎসব, পাখির কিচিরমিচির ডাক সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন জানিয়ে দিচ্ছে, ফাল্গুন এসে গেছে।
এই রকম এক ফুল ফোটার দিনে, পাখি ডাকার দিনে, পহেলা ফাল্গুনেই আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গন থেকে ঝরে পড়েছিল এক অনন্য ফুল। আমরা হারিয়েছিলাম এক পাখিকে। বাংলার জাঁদরেল অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদীকে।
এই অসাধারণ জ্ঞানভান্ডারের মানুষটির সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে মাত্র দুবার। কিন্তু বিশ্বাস করি, তার সঙ্গে দুই হাজারবার দেখা হলেও তৃপ্তি মিলত না। তার সঙ্গে কথা বলার, সান্নিধ্যে থাকার আকাক্সক্ষা অপূর্ণই থেকে যেত। টেলিফোনে কথা হয়েছে অনেকবার। মিডিয়ার অন্যরা ফোন ধরলে বলতেন, ‘হ্যালো।’ কিন্তু ফরিদী ভাই বলতেন, ‘ক্যামন আছো? বলো?’
তখন আমার মোবাইল ছিল না। ভোরের কাগজের টিএন্ডটি ফোন থেকে কল দিতাম। মনে মনে ভাবতাম, কীভাবে চিনলেন? পরে জানতে পারি, পরিচিত বা অপরিচিত যেই হোক না কেন, তিনি ফোন ধরেই বলতেন, ‘ক্যামন আছো? বলো?’ এই একটুকু আন্তরিক সম্ভাষণেই ভুলে যেতাম কেন ফোন করেছি। সত্যিই ভুলে যেতাম।
এই শহরে হুমায়ূন আহমেদের মতোই আরেকজন ম্যাজিকম্যান ছিলেন হুমায়ুন ফরিদী। তাকে নিয়ে হুমায়ূন আহমেদও গল্প করেছেন, লিখেছেন তার স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের কথা। একবার বেইলি রোডের ফুটপাতে বসে চা-বিড়ি খাচ্ছিলেন ফরিদী ভাই। তাকে ঘিরে রাজ্যের ভিড়। তিনি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চা খাচ্ছেন, বিড়ি টানছেন; আর মানুষ তাকিয়ে আছে মুগ্ধ হয়ে, যেন এ দৃশ্য দেখেই তাদের জীবন ধন্য। ঠিক যেমন স্ট্রিট ম্যাজিশিয়ানদের ঘিরে ভিড় হয়। সত্যিই তিনি ছিলেন এক জাদুকর। তার অভিনয়ের পরতে পরতে ছিল জাদু। টানা তিন দশক তার ক্যারিশম্যাটিক, ম্যাজিকাল অভিনয়ে বুঁদ হয়ে ছিল পুরো অভিনয়প্রিয় বাঙালি জাতি।
তার কথাবার্তাও ছিল স্পষ্ট, মারমার-কাটকাট। এক টিভি অনুষ্ঠানে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘আপনি ধূমপান কেন করেন?’ তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এনজয় করি, তাই।’ উপস্থাপিকা বললেন, ‘আপনি তো জানেন ধূমপান ক্ষতিকর। তারপরও কেন?’ একটু চুপ থেকে তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষ অনেক সময় জেনে-শুনেও খারাপ কিছু করে। ক্ষতিকারক জেনেও খায়। আমার ব্যাপারটাও অনেকটা ওরকম। এর বাইরে কিছু নয়।’ কী সহজ, সরল আর সৎ জবাব! তিনি কখনো ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলতেন না।
একবার তার সঙ্গে একই গাড়িতে শুটিং সেটে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সেই যাত্রার স্মৃতি আজও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়।
তিনি কখনো হিরো হতে চাননি; হতে চেয়েছিলেন অভিনেতা। এবং তিনি হয়েছিলেনও একজন প্রকৃত অভিনেতা। এই অভিনয় দিয়েই তিনি সবার মনে বেঁচে থাকবেন।
২০১২ সালের এই দিনে তিনি চলে গিয়েছিলেন নিঃসঙ্গতা থেকে নিষ্ঠুর একাকিত্বে। ফাগুন এলেই তাই তার কথা মনে পড়ে। ওপারে ভালো থাকবেন, ফরিদী ভাই।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন