মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এক সাধারণ কর্মচারী হয়েও গত ৩৫ বছর ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে স্টেনোটাইপিস্ট মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। জেলার স্বাস্থ্য খাতে ‘অঘোষিত পরিচালক’ হিসেবে পরিচিত এই কর্মচারীর ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ফাঁস হওয়ার পর জেলাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
গত মঙ্গলবার মিজানুর রহমানের ঘুষ গ্রহণের একটি ৪২ সেকেন্ডের ভিডিও ভাইরাল হয়। ভিডিওটিতে দেখা যায়, মিজানুর রহমান এক ব্যক্তির সঙ্গে অত্যন্ত সাবলীলভাবে ঘুষের টাকা নিয়ে দর কষাকষি করছেন। তাকে বলতে শোনা যায়, ‘কত আনছেন?’ অপর পক্ষ উত্তরে বলেন, ‘৫০ (হাজার) আনছি স্যার।’ জবাবে মিজান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি তো ৭০ আনতে বলছি। ৫০-এ হবে না।’ একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে অপর পক্ষ বলেন, ‘আপাতত ৫০ নিতে বলছে।’ তখন মিজান বলেন, ‘ও আচ্ছা, ঠিক আছে।’ যদিও এই ভিডিওর বিষয়ে জানতে চাইলে মিজানুর রহমান দাবি করেন, এটি তার বাসা ও দোকান ভাড়ার টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, জেলার অধিকাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন প্রক্রিয়া মিজানের নিয়ন্ত্রণে। সিভিল সার্জন অফিসের একাধিক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নিয়মিত নবায়ন নেই। তবে নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসোহারা বা সমঝোতা করলে নবায়ন ছাড়াই এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ করে দেন মিজান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ক্লিনিক মালিক জানান, লাইসেন্স নবায়নের জন্য দীর্ঘদিন ঘুরে কাজ না হওয়ায় মিজানকে ৮০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেতেও তাকে অতিরিক্ত ৪৫ হাজার টাকা দিতে হয়।
জানা যায়, মিজানুর রহমান ১৯৮৮ সালে চাকরিতে যোগদানের পর থেকে অধিকাংশ সময় মুন্সীগঞ্জেই অবস্থান করছেন। ১৯৯৯ সালে তাকে ঢাকায় বদলি করা হলেও ২০০১ সালে পুনরায় মুন্সীগঞ্জে ফিরে আসেন। পিরোজপুর ও মাদারীপুরে একাধিকবার বদলির আদেশ হলেও প্রতিবারই হাইকোর্টে রিট করে তিনি বদলি স্থগিত করেন এবং একই কর্মস্থলে বহাল থাকেন। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর মাদারীপুরে বদলির আদেশ হলেও তিনি অদৃশ্য ক্ষমতায় মুন্সীগঞ্জেই রয়ে গেছেন।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ওমরাহ করতে গিয়ে সৌদি আরবে অবৈধ স্বর্ণ ও রিয়ালসহ আটক হন মিজান। সেখানে প্রায় দুই মাস কারাভোগের কারণে তিনি নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে যোগ দিতে পারেননি। একজন সরকারি কর্মচারীর বিদেশে আটক হওয়া এবং জেল খাটার বিষয়টি গোপন রেখে তিনি এখনো স্বপদে বহাল আছেন।
ঘুষ ও অনিয়মের বিষয়ে মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ভিডিও ফুটেজটা দেখেছি। এটা আমার বাসা ও দোকান ভাড়ার টাকা।’
এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. কামরুল জমাদ্দার বলেন, ‘আমি ভিডিওটি দেখেছি এবং বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে আমরা কোনো ছাড় দেব না। ইতিমধ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলেই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

