সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকা- বর্তমানে এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। উপজেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদÑ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি)Ñ দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত কর্মকর্তা ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে। নিয়মিত কর্মকর্তার অনুপস্থিতি এবং অতিরিক্ত দায়িত্বের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় উপজেলা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে দৃশ্যমান স্থবিরতা নেমে এসেছে। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ সেবাপ্রার্থীরা।
প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১০ জুন ইউএনও মোহাম্মদ শাহজাহান বদলি হওয়ার পর থেকে পদটি শূন্য রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলানোর জন্য জেলা প্রশাসন জগন্নাথপুর উপজেলার ইউএনও মো. ইসলাম উদ্দিনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করেছে। অন্যদিকে, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফাতেমা তুজ জোহরা চলতি বছরের ১০ মে থেকে পাঁচ মাসব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণে রয়েছেন। প্রশাসনের প্রধান এই দুই কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে উপজেলা কার্যালয় এখন কার্যত অভিভাবকহীন অবস্থায় দিন পার করছে।
সরেজমিনে শান্তিগঞ্জ উপজেলা কার্যালয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন কাজে আসা মানুষের ভিড়। কিন্তু সেবার নিশ্চয়তা নেই। জগন্নাথপুর উপজেলার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ইউএনও সপ্তাহে সীমিত সময় শান্তিগঞ্জে উপস্থিত থাকতে পারেন। ফলে জরুরি প্রশাসনিক অনুমোদন, দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিষ্পত্তি, আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধনের মতো সেবাগুলো মারাত্মকভাবে বিলম্বিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জরুরি স্বাক্ষর বা অনুমোদনের জন্য সেবাগ্রহীতাদের একাধিকবার উপজেলা পরিষদে এসেও কাক্সিক্ষত সমাধান না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। এতে ভুক্তভোগীদের আর্থিক ক্ষতিসহ সময়ের অপচয় হচ্ছে।
ভুক্তভোগী কৃষক জমির উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘জমির নামজারি নিয়ে গত তিন সপ্তাহ ধরে দৌড়াচ্ছি। এসি ল্যান্ড প্রশিক্ষণে আছেন, আর যিনি অতিরিক্ত দায়িত্বে আছেন তিনি কবে আসবেন তার ঠিক নেই। আমার অনেক কর্মদিবস নষ্ট হলো, কিন্তু ফাইলের কোনো কাজই এগোলো না।’
একই অভিযোগ স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. শফিকুল ইসলামের। তিনি বলেন, ‘জরুরি একটা ট্রেড লাইসেন্স বা প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য বারবার ঘুরতে হচ্ছে। ইউএনও এক উপজেলার দায়িত্ব সামলাবেন, নাকি দুই উপজেলার? আমাদের দেখার জন্য এখানে নিয়মিত কোনো কর্মকর্তা নেই, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।’
শুধু সাধারণ সেবা নয়, সরকারি উন্নয়নমূলক কাজগুলোর গতিও থমকে গেছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা জানান, ইউএনওর সরাসরি তদারকি ছাড়া অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পূর্ব পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুক মিয়া বলেন, ‘একজন কর্মকর্তার পক্ষে দুটি উপজেলার প্রশাসনিক দায়িত্ব সমানতালে পালন করা প্রায় অসম্ভব। উপজেলার প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কাজ ইউএনওর নিয়মিত তদারকিতেই চলে। কর্মকর্তার অভাবে এখন উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজেও ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জনস্বার্থে আমরা দ্রুত স্থায়ী ইউএনও ও এসি ল্যান্ড পদায়নের দাবি জানাচ্ছি।’
উপজেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, নীতিনির্ধারণী অনেক সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকায় ইউনিয়ন পরিষদগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নিয়মিত তদারকির অভাবে মাঠপর্যায়ের উন্নয়নমূলক কাজগুলোর গুণগত মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সচেতন মহলের মতে, একটি উপজেলার প্রশাসনিক গতিশীলতা বজায় রাখতে ইউএনও ও এসি ল্যান্ডের মতো পদগুলো দীর্ঘ সময় শূন্য রাখা জনস্বার্থের পরিপন্থি। দ্রুত নতুন কর্মকর্তা পদায়ন না করা হলে শান্তিগঞ্জ উপজেলার সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হবে। এখন দেখার বিষয়, জনদুর্ভোগ লাঘবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
এদিকে প্রশাসনিক এই স্থবিরতা সম্পর্কে জানতে চাইলে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ইউএনও মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘আমি জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জÑ উভয় উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করছি। অতিরিক্ত দায়িত্বের কারণে সরকারি কার্যক্রমে বিঘœ ঘটছে না বলে আমি মনে করি।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘স্থায়ী কর্মকর্তা পদায়ন হলে প্রশাসনিক কাজের গতি ও মান নিঃসন্দেহে অনেকগুণ বাড়বে।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন