‘চোখের নিমিষে বাড়িভিটা নদী খায়া গেল বাহে। চারটা ঘর কোনো রকমে সরে নিয়া গেছি। তিনটা আম গাছ, একটা জাম গাছ কাটার আগেই নদীত ডুবে গেইছে। এই শোকে-দুঃখে বাড়ি ভাঙার তিন দিন পর বাবা আব্দুল কাদের (৬০) মারা গেছে। কোনো রকমে চর বিদ্যানন্দ থেকে দক্ষিণে আনন্দ বাজারে অন্যের জমিতে ঘর তুলছি। আমাগো কষ্ট কেউ দ্যাখে না।’
বুকে কষ্ট চেপে মুখ শক্ত করে কথাগুলো বললেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চর বিদ্যানন্দ গ্রামের বাসিন্দা মৃত আব্দুল কাদেরের ছেলে কাফি (৩৫)। কাফি এভাবেই বর্ণনা করলেন নদীভাঙনের ভয়াবহতার কথা। গত ১৫ দিনে রাজারহাটের চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ গ্রামে তিস্তার করাল গ্রাসে ১৯টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তিস্তার ভাঙন চলছে। ঘরবাড়ি, গাছপালা ও আবাদি জমির পাশাপাশি কৃষকের স্বপ্নÑ বাদাম, আমন ধানের বীজতলা, মরিচ ও পাটের খেত মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে নদীগর্ভে। তিস্তায় পানি কমতে শুরু করলে ভাঙনের তীব্রতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ভাঙনের মুখে পড়া স্থানীয় আব্দুল কাদের নামের এক ব্যক্তি প্রিয় ভিটা হারানোর শোকে প্রাণ হারিয়েছেন।
নদীভাঙনের শিকার চর বিদ্যানন্দের ১১টি পরিবারের মধ্যে রয়েছে কাফি, আ. জলিল, রশিদুল ইসলাম, গনি মুন্সী, মোতালিব, আশরাফুল, লোকমান, জয়নাল, আ. সালাম, রফিকুল ও সফিকুল। চর তৈয়বখাঁ গ্রামের ভুক্তভোগী ৮ পরিবারের মধ্যে রয়েছেনÑ মোস্তফা কামাল, রোস্তম, সাত্তার, জহুরুল, আইয়ুব আলী, মোকছেদ, রওশন আরা ও ফকরুল ইসলাম।
তৈয়বখাঁ গ্রামের রোস্তম আলী জানান, ‘এ নিয়ে পাঁচবার নদী আমার ভিটা গিলে খেল। আড়াই বিঘা জমির ফসলসহ সব হারিয়ে এখন অন্যের জমিতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি, কিন্তু আজও কোনো সরকারি সহায়তা পেলাম না।’ স্থানীয় বাসিন্দা আ. জলিল জানান, এলাকার ‘পূর্বচর বিদ্যানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ ও দুটি মসজিদ এখন ভাঙনের কবলে। স্কুল ঘরটি তলিয়ে গেলে শতাধিক শিশুর পড়াশোনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এ ছাড়াও আরও দুই শতাধিক বাড়ি বর্তমানে ভাঙনের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত প্রতিকারের দাবিতে স্থানীয়রা তিস্তাপারে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন।
বিদ্যানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাইজুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের ৭৫ ভাগ এলাকা ইতোমধ্যে মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। চর বিদ্যানন্দ ও তৈয়বখাঁ গ্রাম ভাঙতে ভাঙতে এখন রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার সীমানায় পৌঁছেছে।’
এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘জেলায় বর্তমানে প্রায় ৪০টি পয়েন্টে ভাঙন চলছে। গুরুত্বপূর্ণ ৩০টি পয়েন্টে আমরা জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছি। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয়, চরাঞ্চলের ভাঙন রোধের জন্য আমাদের কোনো বাজেট বরাদ্দ নেই, তাই সেখানে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।’

