‘মাত্র ৭ দিনে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ’, ‘১০ বছরের পুরোনো বাত চিরতরে নির্মূল’, ‘যৌন দুর্বলতার শতভাগ স্থায়ী সমাধান’, কিংবা ‘কিডনি ও লিভারের সব রোগের গ্যারান্টিযুক্ত চিকিৎসা’Ñ এমনই সব অবাস্তব ও চটকদার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে কথিত সব হারবাল ওষুধ। অসুস্থ ও অসহায় মানুষের সরল বিশ্বাস এবং দ্রুত সুস্থ হওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষাকে পুঁজি করে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে। যথাযথ নজরদারির অভাবে এই চক্রটি এখন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
প্রতারক চক্রটি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে অত্যন্ত চতুর ও আকর্ষণীয় পদ্ধতির আশ্রয় নেয়। তারা সাধারণত সুদর্শন নারী বা পুরুষ ব্যবহার করে গানের আসর জমিয়ে তোলে। হারমোনিয়াম বা বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে তাদের দিয়ে জনপ্রিয় ও আবেগঘন সব গান গাওয়ানো হয়, যাতে হাটুরে মানুষজন কৌতূহলী হয়ে ভিড় জমায়। গানের সুর আর সুরের মূর্ছনায় যখন বিপুল সংখ্যক মানুষ এক জায়গায় জড়ো হয়, ঠিক তখনই মূল প্রতারক চক্রটি ওষুধের গুণাগুণ নিয়ে তাদের বাগ্মিতা শুরু করে। সাধারণ মানুষের আবেগ আর বিনোদনের এই সুযোগকে তারা তাদের ব্যবসার মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। একদিকে বিনোদন, অন্যদিকে ‘অলৌকিক’ নিরাময়ের গ্যারান্টিÑ এই দুইয়ের সমন্বয়ে তারা খুব সহজেই সাধারণ মানুষকে সম্মোহিত করে ফেলে এবং মানহীন পণ্য কিনতে প্রলুব্ধ করে।
গত বৃহস্পতিবার উপজেলার ধাপ সুলতানগঞ্জ সাপ্তাহিক হাটে গিয়ে দেখা যায়, জনসমাগমস্থলে গান গেয়ে ও মাইকিং করে মানুষকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। এরপর অত্যন্ত কৌশলে নিজেদের আন্তর্জাতিক মানের গবেষক, অভিজ্ঞ হাকিম কিংবা বিশেষায়িত চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন প্রকারের বোতলজাত তরল, ক্যাপসুল, তেল ও অদ্ভুত ধরনের গুঁড়াজাতীয় পণ্য বিক্রি করছেন তারা। চক্রটি তাদের চিকিৎসার মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য মাঝে মাঝে উপস্থিত লোকজনের মধ্য থেকে নিজেদের লোককেই সাধারণ ক্রেতা সাজিয়ে ওষুধের ভূয়সী প্রশংসা করতে থাকে। এতে প্রলুব্ধ হয়ে সাধারণ মানুষ এসব নামসর্বস্ব ওষুধ কিনতে ভিড় করছেন।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে অন্যতম আব্দুল গফুর জানান, তিনি দীর্ঘদিনের শারীরিক সমস্যার সমাধানের আশায় প্রতারকদের খপ্পরে পড়ে কয়েক হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। কিন্তু কোনো ফল তো মেলেনি, বরং নিয়মিত সেবনের ফলে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। পরবর্তী সময়ে স্বীকৃত চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর তিনি জানতে পারেন, এসব পণ্যের কার্যকারিতা বা কোনো সরকারি অনুমোদনের নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। তার মতো আরও অনেক ভুক্তভোগীই না বুঝে এসব বিষপানের শিকার হচ্ছেন।
বিষয়টি নিয়ে জেলা ওষুধ প্রশাসনের কর্মকর্তা মরুময় সরকার বলেন, কোনো ওষুধই বাজারজাত করার আগে গবেষণা, ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা ও সরকারি অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। আইন অনুযায়ী, এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে কোনো ধরনের ওষুধ বৈধভাবে বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই। হাটে বিক্রি হওয়া এসব কথিত হারবাল পণ্যের ক্ষেত্রে ওই ধরনের কোনো আইনি অনুমোদনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
চিকিৎসকদের মতে, রোগ নির্ণয় ছাড়া যেকোনো ওষুধ সেবন অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যদি এসব অননুমোদিত ওষুধ সেবন করেন, তবে তাদের শারীরিক জটিলতা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। দ্রুত কার্যকারিতা দেখানোর নামে অনেক ক্ষেত্রে এসব পণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক বা নিষিদ্ধ স্টেরয়েড মেশানোর আশঙ্কা থাকে, যা মানবদেহের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ।
উপজেলা মানবাধিকার সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আমিনুল ইসলাম জানান, শুধু অভিযান চালিয়ে এসব বন্ধ করা কঠিন। মানুষের অজ্ঞতা এবং দ্রুত সুস্থ হওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষাকেই এই প্রতারকরা ব্যবসার পুঁজি করে নিয়েছে। তাই নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। ভুক্তভোগীদের মতে, এক হাট থেকে অন্য হাটে ঘুরে একই কৌশলে প্রতারণা চালিয়ে যাওয়া এই চক্রটিকে ধরতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। নতুবা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাবে।

