ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই, ২০২৬

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ

সরকারি খাল দখল করে স্থাপনা আদালতের সুয়োমোটো মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক, চাঁদপুর
প্রকাশিত: জুলাই ৯, ২০২৬, ০৭:৫০ এএম

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার চৌরাঙ্গি বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সরকারি খালটি প্রভাবশালী মহলের দখলে চলে যাওয়ার ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন আদালত। খালের ওপর অবৈধভাবে গড়ে তোলা দোকানপাট ও পাকা স্থাপনা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ আমলে নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) মামলা দায়ের করেছেন ফরিদগঞ্জ আমলি আদালতের জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ বর্ধন।

গত মঙ্গলবার বিকেলে চাঁদপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নাজির ফখরুদ্দিন আহমেদ স্বপন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আদালতের এই সাহসী পদক্ষেপ সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।

জানা যায়, গত ৩০ জুন ওই খাল নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে উঠে আসে, দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী চক্র সরকারি খাল দখল করে অবৈধ দোকানপাট ও বহুতল পাকা স্থাপনা নির্মাণ করেছে। খালের ওপর এমন অবৈধ কাঠামোর ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে কেবল এলাকার পরিবেশই নষ্ট হচ্ছে না, বরং স্থানীয় কৃষকদের সেচ ব্যবস্থা ও কৃষি উৎপাদনও বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

এই প্রতিবেদনটি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলাটি রুজু করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’ অনুযায়ী সরকারি জমি কিংবা জলাশয় জবরদখল করা একটি আমলযোগ্য অপরাধ। এ ধরনের কর্মকা- কেবল আইন অমান্য করাই নয়, বরং জনস্বার্থ, পরিবেশ এবং কৃষি অর্থনীতির ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আদালত ফরিদগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ফৌজদারি কার্যবিধির ২০২ ধারার অধীনে ঘটনাটি সরেজমিনে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে আদালতে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, প্রতিবেদনে খালের ওপর অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণকারী ও সেখানে নিয়মিত ব্যবসা পরিচালনাকারীদের নাম-ঠিকানা, দখলের ধরণ এবং সংশ্লিষ্ট সকল নথিপত্রসহ বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে হবে।

আদালতের এই স্বতঃপ্রণোদিত হস্তক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও আইনজ্ঞরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সম্পত্তি দখলকারীরা রাজনৈতিক প্রভাব বা অন্য উপায়ে পার পেয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আদালতের এই কঠোর বার্তা দখলকারীদের মনে আতঙ্ক তৈরি করবে এবং ভবিষ্যতে সরকারি জলাশয় দখল করা থেকে নিরুৎসাহিত করবে। পরিবেশবাদী ও স্থানীয় কৃষকরা মনে করছেন, খালের স্বাভাবিক গতিধারা ফিরে পেলে কৃষিতে বড় ধরনের সুফল আসবে।

এ বিষয়ে স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহিম (৬০) বলেন, খালটি দখল হওয়ার পর থেকে আমরা কৃষকরা চরম বিপাকে আছি। আগে খাল দিয়ে পানি আসত, এখন সব বন্ধ। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা হয়, আবার শুকনো মৌসুমে খেতে সেচের পানি পাই না। প্রভাবশালীরা খাল ভরাট করে দোকান তোলায় কৃষিকাজ লাটে ওঠার দশা। আদালতের এই আদেশে আমরা আশার আলো দেখছি। চাই দ্রুত দখলমুক্ত হোক, আমাদের কৃষি জমিগুলো আবার প্রাণ ফিরে পাক।

সরকারি সম্পত্তি পুনরুদ্ধার এবং জনস্বার্থ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আদালতের এই উদ্যোগ এখন ফরিদগঞ্জ উপজেলাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। সচেতন মহল বলছেন, চৌরাঙ্গি বাজারের পরিবেশ ও ব্যবসায়িক কর্মকা- এখন দখলদারদের কবলে। খালের ওপর অবৈধ স্থাপনা তৈরি করায় পানি নিষ্কাশনের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে গেছে। আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত এ উদ্যোগকে তারা সাধুবাদ জানান। তারা চান, আইন অনুযায়ী যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত খালটি দখলমুক্ত করা হোক এবং দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।