ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই, ২০২৬

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন

জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত নগরী

মঞ্জুরুল ইসলাম, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত: জুলাই ৯, ২০২৬, ০৭:৫২ এএম

চলতি মৌসুমে ময়মনসিংহে রেকর্ড পরিমাণ ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। গত মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে টানা সাড়ে আট ঘণ্টার অবিরাম ধারায় তলিয়ে গেছে শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা। প্রধান সড়ক, হাসপাতাল চত্বর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে আবাসিক এলাকার অলিগলিÑ সবখানেই এখন থইথই পানি। বৃষ্টির তোড়ে জলমগ্ন অবস্থায় চরম ভোগান্তিতে দিন কাটাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সেই সঙ্গে ড্রেন উপচে নোংরা পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় দুর্ভোগের মাত্রা ছাড়িয়েছে চরমে। দ্রুত পানি নিষ্কাশন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে এই জলাবদ্ধতা প্রতি বছরই স্থানীয়দের জন্য এক বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মঙ্গলবার রাত ১২টা ৩০ মিনিট থেকে বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত মাত্র সাড়ে ৮ ঘণ্টায় ১৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বছরের এই সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতে মুহূর্তেই অচল হয়ে পড়ে নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা। সানকিপাড়া, আকুয়া, গোলকীবাড়ী, বলাশপুর, চরপাড়া, খাগডহর, গাঙ্গিনারপাড়, নতুন বাজার, জেলা স্কুল মোড় ও কেওয়াটখালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো হাঁটু সমান পানির নিচে তলিয়ে যায়। অলিগলির ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ায় আসবাবপত্র ও মালামাল নষ্ট হয়ে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে স্থানীয়দের।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে চরপাড়া মোড় ও হাসপাতাল এলাকায়। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মুমূর্ষু রোগী ও তাদের স্বজনদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। জামালপুর থেকে আসা রোগী আবুল বাশার জানান, রাস্তায় হাঁটুপানির কারণে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে কয়েকশো মিটার পথ পাড়ি দিতেই এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। এমনকি হাসপাতালের ভেতরে পানি প্রবেশ করায় চিকিৎসাসেবা নিতে আসা মানুষ পড়েছেন বিপাকে।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ চলছে দাবি করা হলেও বাস্তবে এর সুফল মিলছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। সানকিপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী আবু সাঈদ বলেন, ‘অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ড্রেনে ময়লা আবর্জনা জমে থাকা এবং খাল দখলের কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া শহরের অনেক জায়গায় ড্রেনের মাঝখানে বিদ্যুতের খুঁটি থাকায় পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’

সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, শুধু অস্থায়ীভাবে পানি সেচে জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়। এজন্য খাল পুনরুদ্ধার এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর জেলা সভাপতি ইয়াজদানী কোরাইশী কাজলের অভিযোগ, বর্তমান ড্রেনেজ নির্মাণগুলো অপরিকল্পিত, যা নগরবাসীর জন্য কোনো টেকসই সমাধান বয়ে আনছে না।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মেয়াদে সিটি করপোরেশনের আওতায় ৬২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩২২ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণের একটি মেগা প্রকল্প চলমান। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পথে থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৫৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের এই ধীরগতিই বর্তমান ভয়াবহ জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন নগর বিশেষজ্ঞগণ।

এদিকে, বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেনের নোংরা পানি মিশে যাওয়ায় নগরজুড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশন এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান সরকার জানান, ‘ভারী বৃষ্টির কারণে নগরীতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও দ্রুত পানি নামছে। সকাল থেকে আমি বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছি। মূলত অলিগলিতে পানি জমে আছে। এর কারণ হচ্ছে বহুতল ভবনের মালিকগণ অপরিকল্পিতভাবে ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা ফেলে এই অবস্থার সৃষ্টি করেছে।’