স্বাস্থ্যসেবার ভরসাস্থল হওয়ার কথা একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। কিন্তু নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সেই ভরসার জায়গাটিই এখন ধীরে ধীরে আস্থাহীনতার প্রতীকে পরিণত হচ্ছে। কাগজে-কলমে ৫০ শয্যার এই হাসপাতাল প্রতিদিন গড়ে ছয় শতাধিক রোগীর চাপ সামাল দিতে গিয়ে কার্যত নাজেহাল অবস্থায় পড়েছে। সীমিত জনবল, অপ্রতুল অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় পুরো সেবাব্যবস্থা টালমাটাল হয়ে উঠেছে।
এই হাসপাতালটি শুধু কলমাকান্দা উপজেলার মানুষের জন্যই নয়, পাশের সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর ও ধর্মপাশা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মানুষের জন্যও প্রধান ভরসা। প্রতিদিনই এসব এলাকা থেকে বহু রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে রোগীর চাপ আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
তবে হাসপাতালের প্রবেশদ্বার থেকেই শুরু হয় ভোগান্তি। আউটডোর টিকিটের সরকারি মূল্য ৩ টাকা হলেও রোগীদের কাছ থেকে ৫ টাকা নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার পেছনে কোনো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা না থাকায় রোগীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
চিকিৎসক সংকট এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। অনুমোদিত ৪১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২০ জন চিকিৎসক। এর মধ্যেও ডেপুটেশন ও অনুপস্থিতির কারণে বাস্তবে চিকিৎসকসংখ্যা আরও কমে গেছে। ফলে প্রতিদিনের বিপুল রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সীমিত সংখ্যক চিকিৎসকের মধ্যেও ডেপুটেশন ও অনুপস্থিতির কারণে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন চিকিৎসক দীর্ঘদিন ধরে নিজ কর্মস্থলের বাইরে দায়িত্ব পালন করছেন বা অনুপস্থিত রয়েছেন।
তথ্য অনুযায়ী, কার্ডিওলজি বিভাগের ডা. এ. কে. এম আব্দুল্লাহ আল মামুন ২০২৩ সাল থেকে নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে কর্মরত। চক্ষু বিভাগের ডা. মো. আব্দুল হান্নান ২০১৭ সাল থেকে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। শিশু বিভাগের ডা. মোহাম্মদ নঈম ইকবাল মোল্লা ২০২৪ সাল থেকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন।
এ ছাড়া সহকারী সার্জন ডা. জেন্টি মজুমদার ২০২৪ সাল থেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেপুটেশনে রয়েছেন। অন্যদিকে, আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. সজীব পাল চৌধুরী ২০১৯ সাল থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত বলে জানা গেছে।
ফলে কার্ডিওলজি, চক্ষু, শিশু ও সার্জারি বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো স্থানীয়ভাবে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে, যা রোগীদের জন্য বড় ধরনের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু চিকিৎসক নয়, অন্যান্য জনবল সংকটও প্রকট। উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, স্বাস্থ্য সহকারীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় সীমিত জনবল দিয়েই পুরো হাসপাতালের কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।
হাসপাতালের ভেতরের বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও জনবল না থাকায় অনেক সেবা বন্ধ হয়ে আছে। রেডিওগ্রাফার না থাকায় এক্স-রে মেশিন দীর্ঘদিন ধরে অচল। অপারেশন থিয়েটারে সরঞ্জাম থাকলেও অ্যানেসথেটিস্ট ও গাইনি বিশেষজ্ঞের অভাবে সিজারিয়ান অপারেশন কার্যত বন্ধ রয়েছে।
শয্যা সংকটও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ৫০ শয্যার বিপরীতে কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি হওয়ায় অনেককে বেড ছাড়াই থাকতে হচ্ছে। কেউ করিডোরে, আবার কেউ মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন—যা একদিকে অমানবিক, অন্যদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে এমনই এক হৃদয়বিদারক চিত্র দেখা গেছে। কুড়িয়া রাজনগর গ্রামের আহসন আলীর গর্ভবতী মেয়ে তানজিলা আক্তার জ্বর ও কাশিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু ভর্তি হওয়ার পরও পাননি কোনো শয্যা। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাকে।
মেয়ের এমন অবস্থায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আহসন আলী বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তি করেও যদি বেড না পাই, তাহলে আমরা যাব কোথায়? গর্ভবতী মেয়েকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে—এটা খুব কষ্টের। গরিব মানুষ বলে কি আমাদের কষ্টটা কেউ দেখবে না?’
জরুরি সেবার ক্ষেত্রেও চিত্র সন্তোষজনক নয়। একটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালক সংকটে সেটি কার্যত অচল পড়ে আছে। ফলে রোগীদের ব্যক্তিগত অ্যাম্বুলেন্সের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
হাসপাতালের রান্নাঘরের অবস্থা আরও নাজুক। রোগীদের জন্য খাবার প্রস্তুতের স্থানটি প্রায় ব্যবহারের অনুপযোগী। রান্নার সময় ঘন কালো ধোঁয়ায় পুরো ঘর ভরে যায়, যা স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে খাবার প্রস্তুতকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এ বিষয়ে বাবুর্চি মজনু ফকির বলেন, ‘এই পরিবেশে রান্না করা খুবই কষ্টকর। ধোঁয়ার কারণে চোখ জ্বালা করে, শ্বাস নিতে সমস্যা হয়। বহুবার জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
রোগীদের জন্য নির্ধারিত খাদ্যতালিকা থাকলেও বাস্তবে তা অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় নিম্নমানের ও অপর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হয়, যা রোগীদের অসন্তোষ আরও বাড়াচ্ছে।
উপজেলার তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাও প্রায় অচল। আটটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মধ্যে কার্যকর রয়েছে মাত্র দুটি। বাকি কেন্দ্রগুলো কোথাও অবকাঠামোর অভাবে, কোথাও জনবল সংকটে বন্ধ হয়ে আছে। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা অন্যত্র ডেপুটেশনে থাকায় সেগুলো কার্যত সেবা দিতে পারছে না।
স্থানীয়দের ভাষায়, ‘সবকিছু কাগজে ঠিক আছে, কিন্তু বাস্তবে সেবা নেই।’
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ৫০ শয্যার এই হাসপাতাল দিয়ে বাড়তে থাকা রোগীর চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। তাই দ্রুত এটিকে ২০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবি জোরালো হচ্ছে। তাদের মতে, শয্যা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ, ডেপুটেশন নিয়ন্ত্রণ এবং অচল উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো চালু না করলে পুরো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আরও ভেঙে পড়বে।
কলমাকান্দা প্রেসক্লাবের সভাপতি শেখ শামীম বলেন, বর্তমানে হাসপাতালের অবস্থান কিছুটা ভালো আছে। ‘এই হাসপাতালটি এখন শুধু একটি উপজেলার নয়, আশপাশের কয়েকটি উপজেলার মানুষের একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেই তুলনায় জনবল, শয্যা ও সেবার কোনো সমন্বয় নেই। দ্রুত বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিয়ে হাসপাতালটি সম্প্রসারণ না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আল মামুন জানান, জনবল সংকট ও ডেপুটেশনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। শূন্য পদ পূরণ করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তবে স্থানীয়দের দাবি—শুধু আশ্বাস নয়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমেই ফিরতে পারে মানুষের আস্থা। তা না হলে সরকারি এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি আরও দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন