‘বিল দেখতে চলন, গ্রাম দেখতে কলম’—একসময় প্রবাদে খ্যাত চলনবিল ছিল বিশাল জলরাশি, সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য এবং দেশীয় মাছের অফুরন্ত ভাণ্ডার। বর্ষায় দিগন্তজোড়া পানির ঢেউ আর শুষ্ক মৌসুমে উর্বর ফসলের মাঠ ছিল এ বিলের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নদ-নদীর নাব্যতা সংকট, বাঁধ ও মহাসড়ক নির্মাণ, পুকুর খনন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের বৃহত্তম এ জলাভূমি আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
গবেষণা ও বিভিন্ন তথ্যসূত্র অনুযায়ী, গত ১১২ বছরে চলনবিলের আয়তন প্রায় ৫১৮ বর্গকিলোমিটার কমেছে। প্রতিবছর গড়ে বিলের আয়তন কমছে প্রায় ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ হারে।
একসময় রাজশাহী বিভাগের ছয় জেলা নিয়ে বিস্তৃত থাকলেও বর্তমানে নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার ১০টি উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার ৬০০ গ্রাম নিয়ে চলনবিলের বিস্তৃতি। আগে এর আয়তন এক হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি থাকলেও বর্তমানে বর্ষা মৌসুমে জলমগ্ন এলাকা প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে তা নেমে আসে মাত্র ৮৫ বর্গকিলোমিটারে।
চলনবিলে একসময় ৪৭টি ছোট-বড় নদীর প্রবাহ ছিল। বর্তমানে অধিকাংশ নদী পলি জমে নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে নদ-নদী দিয়ে পর্যাপ্ত পানি বিলে প্রবেশ করতে পারে না। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে দেশীয় মাছের ওপর।
একসময় চলনবিলের বোয়াল, রুই, কাতলা, চিতল, গজার, শোল, পাবদা, আইড়, দেশি পুঁটি, টেংরা, মাগুর, শিং, কই, টাকি, বাইনসহ অসংখ্য দেশীয় মাছ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হতো। বিলের মাছ ও শুঁটকি উৎপাদনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার জেলে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে অবৈধ ‘চায়না দুয়ারি’ ও ‘বাদাই’ জালের ব্যবহার, পানির স্বল্পতা এবং নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশীয় মাছ বিলুপ্তির পথে। ফলে অনেক জেলে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন এবং শুঁটকি উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চলনবিলের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ার অন্যতম কারণ অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। ১৯৮০ সালে বাঘাবাড়ি-তাড়াশ বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের পর বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। পরে ২০০১ সালে হাটিকুমরুল-বনপাড়া ৫৫ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক নির্মাণের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫-৯৬ থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত চলনবিল এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে ১ হাজার ১৮৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১১৩টি সেতু, ৮৫৫টি কালভার্ট, ৯০টি গ্রোথ সেন্টার ও ২১টি স্লুইসগেট। এছাড়া ১৫টি পোল্ডার নির্মাণের জন্য প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বাঁধ দেওয়া হয়েছে। সিংড়ার শেরকোল এলাকায় পানিপ্রবাহের পথ বন্ধ করে নির্মাণ করা হয়েছে হাইটেক পার্ক ও আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার। এতে হাজার হাজার বিঘা জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে, গত ১২ বছরে চলনবিল এলাকায় প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার পুকুর খনন হওয়ায় প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ আরও বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং বিলের আয়তন দ্রুত কমছে।
চলনবিলের প্রধান পানির উৎস বড়াল, গুমানী ও আত্রাই নদী। পদ্মা ও যমুনার পানি এ তিন নদীর মাধ্যমে বিলে প্রবেশ করে। তবে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর পানি প্রবাহ কমতে শুরু করে। পরে বড়াল নদীর উৎসমুখে স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে নদীটি প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো চলনবিলে।
কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) পানাসি প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, চলনবিল এলাকার ২১টি নদ-নদীর অধিকাংশই এখন ভরাটের পথে। এছাড়া ৭১টি খাল ও নালার মোট দৈর্ঘ্য ৪১০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ৩৬৮ কিলোমিটার পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে, যা মোট দৈর্ঘ্যের ৯০ দশমিক ২৪ শতাংশ। বর্তমানে মাত্র ৪২ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কাজ চলছে।
ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, ১৮২৭ সালে জনবসতি বাদ দিয়ে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল প্রায় ১ হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার। ১৯১৯ সালের ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়াতেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। বর্তমানে বিভিন্ন সূত্রে চলনবিলের আয়তন উল্লেখ করা হয়েছে প্রায় ৯০৬ বর্গকিলোমিটার, অর্থাৎ গত ১১২ বছরে বিলের আয়তন প্রায় ৫১৮ বর্গকিলোমিটার কমেছে।
সিংড়া চলনবিল পরিবেশ ও প্রকৃতি আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, অপরিকল্পিত বাঁধ, জলাভূমি ভরাট, পলি জমে নাব্যতা হ্রাস এবং অবৈধ জালের ব্যবহারের কারণে চলনবিলের জীববৈচিত্র্য ও মাছের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চলনবিলকে রক্ষা করেই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে এ বিল তার ঐতিহ্য পুরোপুরি হারাবে।
নাটোর বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস, পলি জমে ভরাট হওয়া এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ চলনবিলের আয়তন কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। বিলের ভেতরের খালগুলোর নিয়মিত পুনঃখনন, পলি অপসারণ এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের এই ঐতিহ্যবাহী জলাভূমিকে সংরক্ষণ করা সম্ভব।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন