টানা চার দিনের ভারী বর্ষণে পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম। গত ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড হওয়ায় নগর ও জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। গত দুই দিনে পাহাড়ধসে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১ হাজার ২২২ জন। তবে প্রশাসনের বারবার সতর্কতা সত্ত্বেও অধিকাংশ বাসিন্দা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ছেড়ে যেতে রাজি হননি।
চট্টগ্রাম নগরের ৩৪টি পাহাড়ে বসবাসকারী লক্ষাধিক মানুষ বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। এর মধ্যে ২৬টি পাহাড়কে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জেলা প্রশাসন। মাইকিংসহ নানা প্রচারণার মাধ্যমে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে আহ্বান জানানো হলেও অনেকেই নিজ নিজ বসতিতে অবস্থান করছেন। ইতোমধ্যে নগরের চশমা পাহাড়, জঙ্গল সলিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে।
অন্যদিকে টানা বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে নগরের নিম্নাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে পানি ঢুকে দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ। আগ্রাবাদ, চকবাজার, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, হালিশহর, পাঁচলাইশ, মুরাদপুর, পতেঙ্গা, কুয়াইশ, আকমল আলী সড়ক, হাজীপাড়া, সিঅ্যান্ডবি মোড়, পলিটেকনিক মোড়, গোলপাহাড় ও কাজীরহাটসহ নগরের বেশিরভাগ এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
শুধু নগর নয়, জেলার বিভিন্ন উপজেলাতেও পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আনোয়ারা, কর্ণফুলী, বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও রাঙ্গুনিয়ায় হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সীতাকুণ্ডে পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে স্থানীয় প্রশাসন মাইকিংসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ভারী বর্ষণে নগরের বিভিন্ন স্থানে রেললাইন পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ রয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের ট্রেন চলাচল। ষোলশহর-জানালিহাট সেকশনের সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকায় মঙ্গলবার দুপুর থেকে রেললাইন প্রায় দুই ফুট পানির নিচে চলে যায়।
রেলওয়ের জনসংযোগ পরিচালক আনিসুর রহমান জানান, লাইনে পানি জমে থাকায় বুধবার ভোরে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা কক্সবাজার এক্সপ্রেস চট্টগ্রামেই আটকে যায় এবং কক্সবাজার যেতে পারেনি।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপক আবু বক্কর সিদ্দিকী বলেন, রেললাইনে পানি উঠে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় ট্রেন চলাচল শুরু হবে। তবে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী ইব্রাহীম খলিল।
এদিকে বুধবার দুপুরে নগরের ষোলশহরের মেয়র গলি এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা পাহাড়সংলগ্ন স্থানে ভূমিধসে সুমাইয়া আক্তার (১১) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। একই দিন সকালে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের খেজুরতলা বাগানবাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসে মারা যায় ১০ মাস বয়সী শিশু আশরাফুল ইসলাম তানভীর। এ ঘটনায় তার মা আহত হয়েছেন।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে মানুষকে সরিয়ে নিতে প্রশাসন সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অনেকেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে পাহাড়ে অবস্থান করছেন। বর্তমানে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ২২২ জন আশ্রয় নিয়েছেন। পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্র ও পানিবন্দি এলাকায় শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুর রহমান খান জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে ১৯৮ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া বুধবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আরও ১৩৩ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন