ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

আখাউড়ায় সরিষায় দুলছে কৃষকের রঙিন স্বপ্ন

আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জানুয়ারি ৪, ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সরিষার হলুদ ফুলের সমারোহ ছড়িয়ে আছে। যতদূর চোখ যায়, কেবল হলুদ আর হলুদ চোখে পড়ে। সরিষার মাঠ দেখে মনে হয়, প্রকৃতি নিজ হাতে হলুদের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে।

হলুদ সরিষা ফুলের মৌ মৌ গন্ধ আকর্ষণ করছে মৌমাছিদের। মধু আহরণে ব্যস্ত মৌমাছির দল মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর এ হলুদ ফুলের মাঝে রঙিন স্বপ্ন বোনা হচ্ছে কৃষকদের।

কৃষকরা জানাচ্ছেন, আগে আমন ধান কাটার পর বেশির ভাগ জমি অনাবাদি থাকত। নানা কারণে ওই সময় জমি ব্যবহার করা সম্ভব হতো না। কিন্তু এখন শীত মৌসুমে সরিষা চাষ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। কৃষি অফিস থেকে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণের সুবিধা থাকায় প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকরা সরিষা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কম খরচে ফসল উৎপাদন এবং ভালো বাজারমূল্য পাওয়ায় এ চাষ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ফলে কৃষকরা ঝুঁকিমুক্তভাবেই সরিষা চাষে আসছে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ মৌসুমে উপজেলায় ৪১০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রণোদনা হিসেবে কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে। দেশে ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ও কম খরচে বেশি লাভের কারণে কৃষকরা সরিষা চাষে উৎসাহী। কৃষি বিভাগ ফলন বৃদ্ধির জন্য সার্বিক সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।

কৃষকরা জানাচ্ছেন, আখাউড়ার বেশির ভাগ জমিতে দুটি ফসল উৎপাদন হয়। সেখানে সরিষা চাষ করলে তিনটি ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়। সরিষা চাষের মূল আকর্ষণ হলো কম সময়ে ও কম খরচে ফসল ঘরে তোলা। বীজ বপনের মাত্র ৭০ দিনের মধ্যে ফসল উঠতে পারে। সেচের প্রয়োজন নেই, উৎপাদন খরচও কম। এতে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন এবং দেশীয় ভোজ্য তেলের চাহিদাও পূরণ হচ্ছে। এ মৌসুমে বারি ১৪, ১৭, বিনা ৮, ৯ ও ১০-সহ বিভিন্ন জাতের সরিষা চাষ করা হচ্ছে।

সরেজমিনে পৌর শহরের তারাগন উপজেলার মোগড়া ও ধরখার এলাকায় সরিষার বিস্তীর্ণ মাঠ হলুদ ফুলে ছেয়ে গেছে। প্রতিটি ফুলে দুলছে কৃষকের রঙিন স্বপ্ন। সরকারি সহায়তায় বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণের ফলে সরিষা চাষে আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে।

মোগড়া এলাকার কৃষক মো. হারিস মিয়া বলেন, ‘গত ৫ বছর ধরে কৃষি অফিসের সহায়তায় সরিষা চাষ করছি। এ মৌসুমে দেড় একর জমিতে বীজ ও সার নিয়ে সরিষা আবাদ করেছি। আশা করছি বাম্পার ফলন হবে। খরচ কম, ফলন বেশি। সেচ, কীটনাশক ও নিড়ানির প্রয়োজন নেই। গত বছর দ্বিগুণ লাভ পেয়েছি, এবারও আশা করছি।’

কৃষক মো. জহির মিয়া বলেন, ‘আগে ধান কাটার পর জমি ফাঁকা থাকত। এখন সরিষা চাষে সেই সময় কাজে লাগানো যায়। দুই মাসের মধ্যেই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব। বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে বোরো ধানের সার ও তেল কেনা যায়। ধান চাষের খরচ ১০ হাজার টাকা হলেও, সরিষা চাষে খরচ মাত্র ২ হাজার টাকার বেশি লাগে। প্রতি বিঘা জমিতে উফশী জাতের ফলন ৫-৬ মণ হয়।’

আখাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, ‘সরিষা গুরুত্বপূর্ণ তেলজাতীয় লাভজনক ফসল। ঝুঁকিমুক্ত হওয়ায় সরিষা চাষ ক্রমেই বাড়ছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী, বিনামূল্যে বীজ-সার সরবরাহ ও পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে। সরিষা চাষ দেশীয় তেল উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ মৌসুমে বাম্পার ফলন আশা করা যাচ্ছে।’