বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পনগরী গাজীপুর। রাজধানী ঢাকার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এ মহানগরে প্রতিদিন লাখো শ্রমিক, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের চলাচল। বিপুল জনসংখ্যা, হাজারো শিল্পকারখানা, ব্যস্ত মহাসড়ক এবং দ্রুত নগরায়ণের কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একসময় মাদক, ছিনতাই, ডাকাতি, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। তবে গত কয়েক মাসে গাজীপুর মহানগরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ডিআইজি মো. ইসরাইল হাওলাদার। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, মাদক নির্মূল এবং জনবান্ধব পুলিশিংকে অগ্রাধিকার দেন। মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের সক্রিয় উপস্থিতি, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, বিশেষ অভিযান এবং প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জিএমপির কার্যক্রমে নতুন গতি আসে।
প্রশাসনিকভাবে জিএমপি দুটি বিভাগে বিভক্ত। উত্তর বিভাগে রয়েছে মেট্রোপলিটন সদর, বাসন, কোনাবাড়ী ও কাশিমপুর থানা। দক্ষিণ বিভাগে রয়েছে গাছা, টঙ্গী পূর্ব, টঙ্গী পশ্চিম ও পূবাইল থানা। এই আটটি থানায় সমন্বিতভাবে অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
টঙ্গীর মাদক স্পটে একের পর এক অভিযান
টঙ্গী দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ব্যবসার অন্যতম স্পর্শকাতর এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। বিশেষ করে কিছু এলাকায় বছরের পর বছর প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ ছিল স্থানীয়দের। দায়িত্ব গ্রহণের পর পুলিশ কমিশনার ইসরাইল হাওলাদারের নির্দেশনায় এসব এলাকায় একাধিক বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়।
মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার এবং নিয়মিত নজরদারির ফলে প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসার প্রবণতা আগের তুলনায় কমেছে বলে স্থানীয়দের অনেকে মনে করছেন। ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, ফেন্সিডিল, প্যাথেডিনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধার এবং মাদক কারবারিদের আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম এখনও অব্যাহত রয়েছে।
ছিনতাই ও ডাকাতি নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান সাফল্য
একসময় গাজীপুরের বিভিন্ন মহাসড়ক, শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকায় ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা প্রায়ই ঘটত। বিশেষ করে রাতের বেলায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা কাজ করত।
বর্তমানে জিএমপির নিয়মিত টহল, চেকপোস্ট, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযানের ফলে এসব অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অস্ত্র উদ্ধার, ছিনতাইকারী ও ডাকাত চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার এবং দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
ঈদযাত্রায় ফিরেছে স্বস্তি
অতীতে ঈদকে কেন্দ্র করে গাজীপুরে ছিনতাই, চুরি, যানজট ও বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ নিয়মিত শোনা যেত। কিন্তু পুলিশ কমিশনার ইসরাইল হাওলাদারের দায়িত্ব গ্রহণের পর অনুষ্ঠিত দুই ঈদে নগরজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
মহাসড়ক, বাস টার্মিনাল, শিল্পাঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, মোবাইল টহল এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষ তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশে গ্রামের বাড়ি যেতে এবং ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফিরতে সক্ষম হয়েছেন। নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে জিএমপির এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ছয় মাসে ১ হাজার ৮৫৪ মামলা, গ্রেপ্তার ৩ হাজার ২১৭
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত গাজীপুর মহানগরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় জিএমপি ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করেছে। পুলিশ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার জানান, ছয় মাসে হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক, অস্ত্রসহ বিভিন্ন অপরাধে মোট ১ হাজার ৮৫৪টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। এসব মামলায় ৩ হাজার ২১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে ২০টি হত্যা, ৭টি ডাকাতি, ২৮টি ছিনতাই, ৮১২টি মাদক এবং ৬০টি অস্ত্র মামলা দায়ের করা হয়েছে।
অভিযান চলাকালে ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২০ রাউন্ড গুলি এবং বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, প্যাথেডিন, ফেন্সিডিল ও দেশি-বিদেশি মদসহ বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে।
নিষিদ্ধ সংগঠনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
জিএমপি জানিয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিল ও শক্তি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় ৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ৯৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে আরও শতাধিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে, যাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এ ছাড়া টঙ্গী পূর্ব থানার পাগাড় বিসিক এলাকায় ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে শক্তি প্রদর্শনের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এজাহারভুক্ত ও তদন্তে শনাক্তসহ ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
জনমুখী পুলিশিং ও শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পুলিশ কমিশনার থানাভিত্তিক সেবা সহজীকরণ, অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ, কমিউনিটি পুলিশিং শক্তিশালীকরণ এবং জনগণের সঙ্গে পুলিশের আস্থা বৃদ্ধি করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
শিল্পাঞ্চলে অতিরিক্ত টহল, শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থা এবং দ্রুত পুলিশি সাড়া দেওয়ার ফলে শিল্প এলাকায়ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।
দেশের অন্যান্য মহানগরের তুলনায় ইতিবাচক অবস্থান
আইন-শৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, শিল্পনগরী হিসেবে গাজীপুরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। তবে ধারাবাহিক অভিযান, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার, মাদকবিরোধী কঠোর অবস্থান এবং জনবান্ধব পুলিশিংয়ের কারণে বর্তমানে দেশের অনেক মহানগরের তুলনায় গাজীপুরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই স্থিতিশীল রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের মূল্যায়ন।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধারা ধরে রাখতে হলে মাদক নির্মূল, কিশোর গ্যাং দমন, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ এবং কমিউনিটি পুলিশিং আরও জোরদার করতে হবে।
নিরাপদ গাজীপুর গড়ার প্রত্যয়
পুলিশ কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার বলেছেন, মহানগরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অপরাধ, সন্ত্রাস, মাদক ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জিএমপি সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে।
দায়িত্ব গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই ধারাবাহিক অভিযান, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান তৎপরতা এবং জননিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কারণে গাজীপুর মহানগর পুলিশের কর্মকাণ্ড ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। একটি নিরাপদ, মাদকমুক্ত ও অপরাধ নিয়ন্ত্রিত গাজীপুর গড়ে তুলতে জিএমপির এই কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে—এমন প্রত্যাশাই নগরবাসীর।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন