ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমে আসার প্রেক্ষাপটে তুরস্ককে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করেছে তেল আবিব। এ কারণেই তুরস্কের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাবনার বিরোধিতা করে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
সম্প্রতি চ্যানেল ১৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইতিহাস আমাদের শেখায়, যখন একটি আঞ্চলিক শক্তির পতন ঘটে, তখন আরেকটি শক্তির উত্থান হয়। আমাদের কাজ হলো নিশ্চিত করা যে ইসরায়েল যেন অন্য সবার চেয়ে দ্রুত এগিয়ে যায়।’
ইসরায়েলের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যে একটি ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সেই শূন্যতা পূরণে তুরস্ক সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসছে।
সিরিয়ায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের সম্প্রসারণ, উন্নত ড্রোন ও যুদ্ধবিমান তৈরির সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গাজায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা—সব মিলিয়ে আঙ্কারা আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার কৌশল বাস্তবায়ন করছে বলে মনে করছে ইসরায়েল।
‘শিয়া অগ্নিবলয়’-এর পরিবর্তে ‘সুন্নি অগ্নিবলয়’
ইসরায়েলের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা গিওরা আইল্যান্ডের মতে, ইরান এতদিন ইসরায়েলকে ‘শিয়া অগ্নিবলয়’ দিয়ে ঘিরে রাখার চেষ্টা করেছে। এখন সেই জায়গায় তুরস্ক ‘সুন্নি অগ্নিবলয়’ গড়ে তোলার পথে এগোচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটেই তুরস্ককে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাবনার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রচারণা শুরু করেছেন নেতানিয়াহু। তাঁর আশঙ্কা, এই যুদ্ধবিমান তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।
এদিকে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের প্রশংসা করে বলেন, ‘আমি এরদোয়ানকে পছন্দ করি। তিনি একজন অসাধারণ নেতা।’
তবে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তুরস্কের বর্তমান নেতৃত্বের ‘আগ্রাসী আকাঙ্ক্ষা’ রয়েছে এবং তাদের হাতে এফ-৩৫ তুলে দিলে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
পরদিন ট্রাম্প জানান, এফ-৩৫ বিক্রির বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এতে ধারণা করা হচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনে মতভেদ তৈরি হয়েছে এবং ইসরায়েল সেই বিরোধিতাকে আরও জোরালো করার চেষ্টা করছে।
‘বস’-এর বিরুদ্ধেও অবস্থান
ট্রাম্প সম্প্রতি মন্তব্য করেছিলেন, ‘নেতানিয়াহু জানেন, বস কে।’
তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এবার এমন একটি ইস্যুতে প্রকাশ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের বিরোধিতা করছেন, যেটিকে তিনি ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, তুরস্ক এমন একজন নেতার অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, যিনি প্রকাশ্যে ইসরায়েলকে ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি সাইপ্রাসে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি এবং গ্রিসের প্রতি আঙ্কারার নীতিরও সমালোচনা করেন।
তাঁর মতে, তুরস্কের হাতে এফ-৩৫ বা উন্নত জেট ইঞ্জিন তুলে দিলে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের আকাশসীমায় প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন