যশোরে ডিগ্রি ছাড়াই আলমগীর কবীর ও আসিফ ইকবাল সাগর নামে দুজন বড় মাপের ডাক্তারের সন্ধান পাওয়া গেছে। তারা সদর উপজেলার বারীনগর সাতমাইল বাজারের আজাদ ডেন্টাল কেয়ারে নিয়মিত রোগী দেখছেন। আলমগীর কবীর নামের আগে চিকিৎসক লিখে তৈরি করেছেন চিকিৎসার প্যাড। তিনি (আলমগীর কবীর) ও সাগর মিলে একই প্যাড ব্যবহার করে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। তারা প্রতি রোগীর কাছ থেকে ব্যবস্থাপত্রের ভিজিট নেন ১০০ টাকা। অধিকাংশ ব্যবস্থাপত্রে প্যাথলজির বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এভাবে আজাদ ডেন্টাল কেয়ারে দন্ত চিকিৎসার নামে মহাপ্রতারণা চলছে বলে অভিযোগ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আলমগীর কবীর আজাদ ডেন্টাল কেয়ার পরিচালনা করছেন। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ওই ডেন্টাল কেয়ারে স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমতি ছাড়াই দন্ত চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করার যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। আলমগীর কবীর ব্যবসা জোরদার করার জন্য আসিফ ইকবাল সাগর নামে একজনকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সাজিয়ে চেম্বারে বসিয়েছেন। সাধারণ মানুষ না বুঝেই প্রতারকদের কাছে ছুটছেন। তাদের খপ্পরে পড়ে মানুষ প্রতারিত হচ্ছেন। তারা ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহার করে চিকিৎসাসেবার নামে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের টাকা। আবার টাকা ব্যয় করেও অনেকে অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছেন। এমবিবিএস অথবা বিডিএস পাস না করেও আলমগীর কবীর ও সাগর ডাক্তার সেজে প্রতিষ্ঠানের সামনে বড় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছেন প্রতারণা জোরদার করার জন্য। সেখানে দাঁতে ব্যথা, দাঁত তোলা, স্কেলিং, ফিলিং (লাইট কিউরসহ), দাঁত বাঁধানো (পিডি, সিডিসহ), উঁচু ও বাঁকা দাঁত সমান করা, রুট ক্যানাল জিনজি ভাইটিস, দাঁতের গোড়া হতে রক্ত পড়াসহ নানা রোগের চিকিৎসা প্রদান করা হয় বলে প্রচার করা হচ্ছে। ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা লিখছেন ডিগ্রিধারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতো।
শনিবার (৭ মার্চ) দুপুরে আজাদ ডেন্টাল কেয়ারে গিয়ে দেখা গেছে, আলমগীর কবীরের প্যাডে রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করছেন আসিফ ইকবাল সাগর। মাহিম নামে এক রোগীর প্রেসক্রিপশনে তিনি চার ধরনের ওষুধ লিখেছেন। এ ছাড়া এক্স-রে করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কথা হলে মাহিমের সাথে আসা এক নারী স্বজন জানান, তাদের বাড়ি চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের আমবটতলা এলাকায়। রোগী দেখার পর ১০০ টাকা ভিজিট নেওয়া হয়েছে। চেম্বারের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, ভুয়া ডাক্তার সাগর এক কিশোরীর দাঁতে ফিলিং করছেন। কথা হলে ওই রোগীর স্বজন জানান, আলমগীর ও সাগরকে ডাক্তার ভেবে দাঁতের চিকিৎসা নেওয়ার জন্য তিনবার এসেছেন। অথচ কাজের কাজ হয়নি।
চিকিৎসা প্যাডে দেখা গেছে, আলমগীর কবীর নামের পরে লিখেছেন দন্ত চিকিৎসক। ডিগ্রি উল্লেখ করেছেন সি আই ডি টি ডেন্টাল। যা বিএমডিসি স্বীকৃত ডাক্তারের কোনো ডিগ্রি না। আরেকজন ভুয়া ডক্তার আসিফ ইকবাল সাগরের চিকিৎসা প্যাড তৈরি করা হয়নি। আজাদ ডেন্টাল কেয়ারে তারা দুইজন প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা ও বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবার নামে অপচিকিৎসা দিচ্ছেন।
আলমগীর কবীর জানান, তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে এক বছরের প্রশিক্ষণ নিয়ে রোগীর চিকিৎসা প্রদান ও ছোটখাটো অস্ত্রোপচার করেন। ডেন্টিস্ট নন তবুও চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করছেন কিভাবে- প্রশ্ন করা হলে সদুত্তর দিতে পারেননি।
আসিফ ইকবাল সাগর জানান, তিনি ঢাকা থেকে ডিডিএস করেছেন। আর ইন্টার্ন করেছেন যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ডাক্তার শের আলীর কাছ থেকে। ডিডিএস ডাক্তারি ডিগ্রি না এটা চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে কাজ করার ট্রেনিং-এর ডিগ্রি। তার সার্টিফিকেট দেখতে চাইলে বলেন, বাসায় রয়েছে চেম্বারে আনা হয়নি। আলমগীর কবীরের প্যাডে তিনি রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন কেন—জানতে চাইলে ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেন।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা জানান, এমবিবিএস ও বিডিএস ডিগ্রিধারী বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশনকৃতরা ছাড়া কেউ নামের আগে-পরে চিকিৎসক লিখতে পারবেন না। ডেন্টিস্ট কোনো ডাক্তারি পদ নয়। তারা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সহকারী। আলমগীর কবীরের সি আই ডি টি ডেন্টাল ও আসিফ ইকবাল সাগরের ডিডিএস ডাক্তারের ডিগ্রি না। গোপনে চিকিৎসাকেন্দ্র খুলে ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহার করে মানুষকে বোকা বানিয়ে ফায়দা লুটছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আজাদ ডেন্টাল কেয়ারে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন