যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি রোগীর চাপ রয়েছে মেডিসিন ওয়ার্ড, শিশু ওয়ার্ড ও করোনারি কেয়ার ইউনিটে। হাসপাতালের চারপাশে রোগী আর রোগী। বারান্দায় রোগী, মেঝেতে রোগী, সিঁড়ির পাশে রোগী, টয়লেটের সামনেও রোগী রাখা হয়েছে। রোগীর চাপে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। শয্যার চেয়ে দ্বিগুনের বেশি রোগী ভর্তি থাকায় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিপাকে রয়েছেন।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বলছেন, রোগীর তুলনায় চিকিৎসক-সেবিকা ও কর্মচারী সংকট রয়েছে। ৫০ শয্যার জনবল দিয়ে চলছে ২৫০ শয্যা হাসপাতাল। ফলে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে হাপিত্যেশ অবস্থা। এ ছাড়া ধার করা জনবল দিয়ে চালানো হচ্ছে আইসিইউ ও সিসিইউ।
জানা গেছে, শুক্রবার ২২১, শনিবার ৬২৮ ও রোববার ৬৩৫ রোগী ভর্তি ছিল। পুরুষ মেডিসিন, মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে, শিশু ওয়ার্ড ও করোনারি কেয়ার ইউনিটে রোগীর ওপর রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এসব ওয়ার্ডে রোগীর চাপে পা ফেলার জায়গা নেই। বারান্দা ছাড়িয়ে রোগীর ঠাঁই হয়েছে ওভার ব্রিজ ও সিঁড়ির পাশে। রোগীর দীর্ঘ সারি পড়েছে। করোনারি কেয়ার ইউনিটে রোগীর চাপ লেগেই আছে। রোগীর চাপ এত বেশি যে নতুন রোগী ভর্তি হলে থাকার জায়গা দেওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে, যেখানে সামান্য জায়গা মিলছে, সেখানেই রোগীর চিকিৎসার জন্য বিছানা দেওয়া হচ্ছে।
রোগীর স্বজন আতিয়ার রহমান, মুনিরা খাতুন, রেজাউল ইসলাম জানান, মেডিসিন ওয়ার্ডে চারপাশে রোগী। একসঙ্গে এত রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসক ও সেবিকারা হিমশিম খাচ্ছে। রোগীর চাপে তারা ঠিকমতো কথা বলতে পারছেন না। সেবিকাদের কাছে গিয়ে ওষুধ আনতে হচ্ছে। তারা রোগীর কাছে আসার সুযোগ পাচ্ছে না।
হাসপাতালের প্রশাসনিক সূত্র জানায়, মোট ২৫০ শয্যার বিপরীতে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ রোগী থাকার বিষয়টি অবশ্যই অবাক ব্যাপার। প্রতিদিন রোগীর চাপ বাড়ায় বর্তমান জনবল দিয়ে চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে হিমশিম অবস্থা। সেই সঙ্গে মারাত্মক জায়গা সংকট রয়েছে। জনবল সংকট মন্ত্রণালয়ে বারবার চাহিদাপত্র পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু সমাধানের কোনো নাম নেই।
সর্বশেষ, ২০২০ সালের ২৮ অক্টোবর ৬০ চিকিৎসক, ১০০ জন সেবিকা ও ১৬৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু আজ অবধি কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। হাসপাতালে মোট চিকিৎসকের পদ রয়েছে ৫২টি। কর্মরত আছেন ৪৬ জন। শূন্য রয়েছে ৬ চিকিৎসকের পদ। এর মধ্যে সিনিয়র কনসালটেন্ট পদ ৩টি ও জুনিয়র কনসালটেন্ট পদ ৩টি। এত স্বল্প পরিমাণে চিকিৎসক দিয়ে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চালানো কষ্টদায়ক হয়ে পড়ছে।
২০০৫ সালে করোনারি কেয়ার ইউনিটের তিনতলা ভবন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। ২০০৬ সালের ১২ অক্টোবর নিজস্ব জনবল ছাড়াই উদ্বোধন হয় যশোর করোনারি কেয়ার ইউনিটের। কিন্তু জনবলের অভাবে চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ ছিল।
২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হাসপাতাল কতৃপক্ষ ২৪ জন চিকিৎসক, ৫৬ জন নার্স ও ১৪৩ জন কর্মচারী নিয়োগের চাহিদাপত্র পাঠায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু কয়েক দফায় ইউনিটটি চালুর সময় পিছিয়ে যায়। শেষমেশ নানা সংকটের মধ্যে ২০০৯ সালের ১২ জুলাই যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের জনবল দিয়েই চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়। সেই থেকে খুঁড়িয়ে চলছে বিভাগটি।
২০২০ সালে ৭৮ জন জনবল চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়। এর মধ্যে চিকিৎসকের পদ ছিল ২০টি, সেবিকার পদ ছিল ৩০টি ও ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির পদ ছিল ২৮টি। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১২ জন চিকিৎসক, ১ জন নার্সিং সুপারভাইজার, ১৩ জন সেবিকা ও ২ জন কার্ডিওগ্রাফার পদের অনুমোদন মেলে। অনুমোদন পাওয়া পদগুলোর মধ্যে ১ জন জুনিয়র কনসালটেন্ট, ১ জন সহকারী রেজিস্ট্রার ও ১ জন রেডিওগ্রাফার যোগদান করেছেন। বাকি পদে আজও কোনো জনবল যোগদান করেননি।
কয়েকজন রোগীর স্বজন জানান, রোগী ভর্তি ৩ তলার ওয়ার্ডে। আর রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন ওভার ব্রিজে। ফলে ঠিকমতো চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। অনেক রোগীর চিকিৎসায় দুর্ভোগ হচ্ছে। চিকিৎসকরা রাউন্ডে আসলেও রোগীর সাথে তেমন কথা বলছেন না। যেখানে সেখানে রোগী শুয়ে থাকায় চিকিৎসক ও সেবিকারা ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছেন না। সেবিকারা ওষুধ দিয়েই চলে যাচ্ছেন। রোগীর চাপের কারণে কথা বলার সময় নেই কারো। ১২ পদের বিপরীতে মাত্র দুই জন চিকিৎসক কর্মরত আছেন।
এদিকে, জনবল সংকটে যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে হাসপাতালের আইসিইউ। ২০২১ সালে করোনাকালীন সময়ে হাসপাতালে আইসিইউ চালু হওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ৪ চিকিৎসককে দায়িত্ব পালনের জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইআরপিপি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ওই ৪ চিকিৎসককে মন্ত্রনালয়ে ফেরত নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে আইসিইউ বিভাগের নিজস্ব কোনো চিকিৎসক নেই। উপজেলা থেকে ধার করা ৫ জন চিকিৎসক দিয়ে কোনোমতে আইসিইউ সেবা চালানো হচ্ছে। ৫ চিকিৎসকের সকলে মেডিকেল অফিসার। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আইসিইউতে নেই।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, চলতি সপ্তাহে ৬০০ থেকে সাড়ে ৬০০ রোগীর সংখ্যা ওঠানামা করছে। মাঝে মাঝে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৭০০ পার হয়ে যায়। এরপরেও রোগী আসলে ভর্তি করা হচ্ছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভর্তি না করার কোনো সুযোগ নেই। ৫২ চিকিৎসক, ২২০ সেবিকা ও ৯৫ ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী দিয়ে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে পুরোপুরি সন্তোষ্ট করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। শীতজনিত রোগে শিশু ও বয়স্করা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। ফলে শিশু ও মেডিসিন ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেড়েছে। এছাড়া ১২ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। তাদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, রোগীর সুবিধার্থে ধার করা চিকিৎসক ও কর্মচারী দিয়ে করোনারি কেয়ার ইউনিট ও আইসিইউ পরিচালনা করা হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন ৫০০ টাকা ব্যয় করে রোগীরা আইসিইউ সেবা পাচ্ছে। একই সেবা বেসরকারি কোনো হাসপাতালে নিতে হলে প্রতিদিন ব্যয় হবে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। সরকারি হাসপাতালের আইসিইউ বন্ধ হলে রোগীদের আর্থিক ক্ষতির সাথে দুর্ভোগও বাড়বে।




