কালের পরিবর্তনের ধারায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী গরু দিয়ে আখ মাড়াই কল। কয়েক বছর আগেও ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে শীত এলেই চোখে পড়ত আখ মাড়াইয়ের ব্যস্ত ও প্রাণবন্ত দৃশ্য। বাড়ির পাশের খোলা জায়গায় আখ মাড়াই করে রস জালানো হতো, আর সেই রস থেকেই তৈরি হতো সুস্বাদু ও খাঁটি গুড়।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষায় এই আখ মাড়াইয়ের আয়োজনকে বলা হতো ‘খোলা’। সাধারণত একটি সমাজের দশ থেকে পনেরোটি পরিবার মিলে একটি খোলা বসাত। আখ মাড়াইয়ের পর যে ছোবড়া বা ডল্লা বের হতো, সেটিই আবার রস জালানোর জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হতো। একেকজন কৃষকের জন্য থাকত একেকদিনের পালা, আর যার পালা থাকত, সবাই মিলে তার আখ মাড়াইয়ের কাজ শেষ করত।
গরু দিয়ে কলের গাছ ঘুরিয়ে সারা রাত পালাক্রমে চলত রস সংগ্রহের কাজ। তবে রস জালানো ছিল অত্যন্ত দক্ষতার বিষয়—এই কাজে যিনি পারদর্শী ছিলেন, তাকে গ্রাম্য ভাষায় বলা হতো ‘বরাতি’। প্রায় এক মাসব্যাপী উৎসবমুখর পরিবেশে একটি খোলা চলত। সবার আখ মাড়াই শেষ হলে খোলা বন্ধ করার সময় শোনা যেত পরিচিত সেই কথা ‘খোলা আউল হবে আগামীকাল।’
কিন্তু এখন সেই চেনা দৃশ্য প্রায় অতীত।
একজন কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, ‘চিনি কলের লোকজনের উপদ্রবে এখন আর সমাজে নিজ উদ্যোগে আখ মাড়াই করা যায় না। তারা নানা সমস্যা তৈরি করে, থানা-পুলিশ এসে মাড়াই কলের ‘ঘুঘু’ খুলে নিয়ে যায়। আমাদের কাছেই মোবারকগঞ্জ চিনি কল রয়েছে, সেখানে আখ দিলেও ঠিকমতো টাকা দেয় না, ওজনেও কম দেয়। এসব কারণেই চাষিদের আখ চাষে আগ্রহ কমে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখনো যদি সরকার আমাদের আগের মতো সুযোগ-সুবিধা দেয়, তাহলে আমরা আবার আখ চাষে ফিরব। আখ চাষ বাড়লে চিনির দামও সবার নাগালের মধ্যে থাকবে। আমরা চাই আগের মতো সবকিছু আবার সহজ হয়ে যাক।’
গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, পারস্পরিক সহযোগিতা ও উৎসবমুখর এই আখ মাড়াই খোলা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। শৈলকুপার কৃষক সমাজের দাবি—সময়োপযোগী উদ্যোগ নেওয়া হলে হয়তো আবার ফিরে আসতে পারে সেই চেনা গ্রাম্য চিত্র, আর ফিরতে পারে আখের মিষ্টি গুড়ের সুবাস।


