জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভার মাঠে মাঠে এখন সরিষার হলুদ ফুলের অপরূপ দৃশ্য। পুরো মাঠ যেন ঢেকে আছে সুন্দর এক হলুদের চাদরে। এই সুযোগে মৌচাষীরাও ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন সরিষার খেত থেকে মধু সংগ্রহে।
সম্প্রতি উপজেলার ভান্ডারীপাড়া, কেসের মোড়, ইসমাইলপুর, জাফরপুর এলাকায় ফসলের মাঠ ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। ফসলের জমির পাশে পোষা মৌমাছির শতশত বাক্স নিয়ে হাজির হয়েছেন মৌয়ালরা। ওইসব বাক্স থেকে হাজার হাজার মৌমাছি উড়ে গিয়ে সরিষা ফুলের মাঠে মধু সংগ্রহে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
উপজেলা কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবছর উপজেলায় ৩৭৫টি মৌবক্স বসানো হয়েছে। এসব বাক্স থেকে ৫ হাজার ১০০ কেজি মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৬২০ কেজি মধু সংগ্রহ হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি মধু সংগ্রহ হবে। কৃষি দপ্তর আরও জানায়, এসব মধু স্বাস্থ্যসম্মত। তারা নিয়মিত পরিদর্শনও করেছেন। প্রতি কেজি মধু ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
মৌচাষী আক্কেলপুর পৌরসভার হাস্তাবসন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, আমরা সরিষা ক্ষেত থেকে বছরে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত মধু সংগ্রহ করে থাকি। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সরিষা থেকে মধু সংগ্রহের উপযুক্ত সময়। আকারভেদে একটি বাক্সে ২০ থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া যায়। প্রতি কেজি মধু ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। মধু মূলত পাইকারি পর্যায়ে বেশি বিক্রি হয়। বিভিন্ন অনলাইন পার্টি ফোনের মাধ্যমে অর্ডার দিয়ে অগ্রিম টাকা পরিশোধ করে। এর আগে নওগাঁতে দুটি মাঠে কাজ শেষ করে এখানে এসেছি। বর্তমানে আমাদের সঙ্গে তিনজন কর্মচারী কাজ করছেন।
তিনি জানান, আমি উপজেলার ভান্ডারীপাড়া নামক স্থানে প্রায় ৪০ হেক্টর সরিষা খেতের ওপর এক মাস মধু আহরণ করে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় দুই লাখ টাকা আয় করতে পারি। এবার ১২০টি বাক্স বসিয়েছি। গত সপ্তাহে সবগুলো বাক্স থেকে প্রায় সাত মণ মধু সংগ্রহ করেছি। প্রতি মণ মধু ১৬ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। তবে এবার আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় পশ্চিমা বাতাসে তেমন মধু সংগ্রহ করতে পারছি না। এখানে আমি ও আরও দুজন সার্বক্ষণিক তদারকি করে থাকি। আমি ১৪ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে মধু আহরণ করে আসছি। এসব মধু দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা পাইকারি ও খুচরা হিসেবে নিয়ে থাকেন।
তিনি আরও জানান, ফুলের মৌসুম না থাকলে মৌমাছিকে চিনি খাওয়াতে হয়। সরিষার মৌসুম শেষে এই মাঠের কাজ শেষ করে আমরা শরীয়তপুর যাব। এরপর দিনাজপুরের বিরলে লিচু বাগানে কাজ করব। সেখানে কাজ শেষ হলে ঠাকুরগাঁওয়ে গিয়ে মিষ্টি কুমড়া ও কালোজিরা থেকে মধু সংগ্রহ করা হবে। আর যখন কোনো মৌসুম থাকে না, তখন মৌমাছিকে টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত চিনি খাওয়াতে হয়।
উপজেলার রুকিন্দীপুর ইউনিয়নের ইসমাইলপুর নামক স্থানে সরিষা ফুল থেকে মধু আহরণের পদ্ধতি সম্পর্কে নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা খুরশিদ আলম জানান, মধু সংগ্রহের জন্য স্টিল ও কাঠ দিয়ে বিশেষভাবে বাক্স তৈরি করা হয়। যার উপরের অংশ কালো রঙের পলিথিন ও চট দিয়ে মোড়ানো থাকে। বাক্সের ভেতরে কাঠের তৈরি সাতটি ফ্রেমের সঙ্গে মোম দিয়ে বানানো বিশেষ কায়দায় এক ধরনের সিট লাগানো থাকে। পরে বাক্সগুলো সরিষা খেতের পাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়।
তিনি বলেন, পাশাপাশি বাক্সগুলোর ভেতরে দেওয়া হয় রানি মৌমাছি। যাকে ঘিরে হাজারো পুরুষ মৌমাছি আনাগোনা করে। রানির আকর্ষণে মৌমাছিরা সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। একটি রানি মৌমাছির বিপরীতে প্রতিটি বাক্সে প্রায় তিন থেকে চার হাজার পুরুষ মৌমাছি থাকে।
জামালগঞ্জ থেকে আসা মধু ক্রেতা মো. হাবিবুর রহমান শাওন বলেন, আমি আমার মেয়েদের নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছি। রাস্তার পাশে সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ দেখে দাঁড়িয়েছি। এক কেজি মধু ৪০০ টাকায় নিয়েছি। আশা করছি, মধুগুলো ভালো হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. ইমরান হোসেন বলেন, ‘উপজেলায় ১,৮০০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। সরিষা ক্ষেতের পাশাপাশি উপজেলার চারটি স্থানে প্রায় ৩৫০টির বেশি মৌবক্স স্থাপন করা হয়েছে। সেসব মৌবক্স থেকে মধু আহরণ শুরু হয়েছে। এবছর মধু সংগ্রহে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ৫ হাজার কেজি। আমরা সব সময় পরামর্শ দিচ্ছি যেন মধু স্বাস্থ্যসম্মত হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘মৌমাছির চাষ হলে সরিষার ফলন ১০ ভাগ বেড়ে যায়। পরাগায়নের মাধ্যমে সরিষার ফলনও ভালো হয়। সরিষা ক্ষেত থেকে বিনা খরচে মধু সংগ্রহ লাভজনক ব্যবসা। এতে একদিকে মৌচাষিরা মধু বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে সরিষার ফলনও বাড়ছে। ফলে উপজেলায় সরিষা চাষের পাশাপাশি মধু চাষের আগ্রহও বাড়ছে।’



