বিঘায় বিঘায় আলু চাষ করে ন্যায্য মূল্য না পেয়ে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কৃষকেরা স্বপ্ন দেখেছিলেন, বোরো ধান চাষ করে কিছুটা ঋণ শোধ করবেন। কিন্তু কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলায় বোরো ধানসহ বসতঘরের টিনের চালা ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
বুধবার দুপুর প্রায় সোয়া একটার দিকে হঠাৎ করে উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যায় একটি ঝড়, যা প্রায় আধা ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এতে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে আসে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আকাশ পরিষ্কার ছিল। হঠাৎ করে দুপুরে ঝড়ের সঙ্গে তীব্র দমকা হাওয়া ও শিলাবৃষ্টি শুরু হলে উপজেলার বিভিন্ন মাঠে পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। অনেক জমিতে ধানের শিষ ভেঙেও যায়। ফলে কৃষকেরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
আক্কেলপুর উপজেলায় ঝড়ের তাণ্ডবে বহু গাছ উপড়ে পড়েছে এবং ডালপালা ভেঙে সড়কের ওপর পড়ে যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। পৌর শহরের সোনামুখী লেঙ্গল পীরের মাজার এলাকায় শতবর্ষী একটি গাছ ভেঙে পড়ায় আক্কেলপুর-বগুড়া সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় বাসিন্দারা গাছটি অপসারণে কাজ করছেন। বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত ওই সড়কে যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। বিকল্প পথ হিসেবে বিহারপুর গ্রামের ভেতর দিয়ে বাস চলাচল করেছে।
এদিকে আক্কেলপুর উপজেলার নবাবগঞ্জ ঘাট মহাশ্মশানের প্রায় একশ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী পাইকর গাছটি কালবৈশাখী ঝড় ও ভারী বৃষ্টিতে ভেঙে পড়েছে। স্থানীয়দের কাছে গাছটি স্মৃতি, ইতিহাস ও আবেগের এক অনন্য প্রতীক ছিল।
অন্যদিকে, বেশ কয়েকটি বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে পড়ায় পুরো আক্কেলপুর উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আক্কেলপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আবদুর রহমান বলেন, ঝড়ে সরবরাহ লাইনের অন্তত সাতটি বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে গেছে এবং বিভিন্ন স্থানে তার ছিঁড়ে পড়েছে। পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে অন্তত দুই দিন সময় লাগতে পারে।
এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বসতঘরের টিনের চালা উড়ে যাওয়া এবং গাছ উপড়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও স্থানীয় সড়কে গাছ পড়ে সাময়িক যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে।
উপজেলার রুকিন্দীপুর ও গোপীনাথপুর এলাকার একাধিক কৃষক জানান, বিঘায় বিঘায় আলু চাষ করে ন্যায্য মূল্য না পেয়ে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বোরো ধান লাগিয়েছিলেন। ধান বিক্রি করে ঋণের চাপ কিছুটা কমানোর আশা ছিল। কিন্তু ধান কাটার ঠিক আগমুহূর্তে এমন শিলাবৃষ্টি তাঁদের সেই স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে।
তেমারিয়া গ্রামের কৃষক রাশেদুল ইসলাম পাইলট বলেন, “মৌসুমের কষ্টে ফলানো বোরো ধান এক ঝড়ে শেষ হয়ে গেল। এখন কীভাবে ঋণ শোধ করব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছি।”
আক্কেলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা জান্নাত বলেন, উপজেলার বেশ কয়েকটি স্থানে গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে পড়েছে, সেগুলো অপসারণ করা হচ্ছে। তবে আক্কেলপুর-সান্তাহার সড়কের শান্তা গ্রামে পড়ে থাকা গাছটি এখনো অপসারণ করা যায়নি। সকালের মধ্যে রাস্তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে এবং কৃষকদের ক্ষতির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
আক্কেলপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. ইমরান হোসেন ক্ষতিগ্রস্ত মাঠ পরিদর্শন করছেন এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। দ্রুত ধান কেটে নিরাপদে ঘরে তোলার জন্য তিনি কৃষকদের আহ্বান জানিয়েছেন।
কৃষি কর্মকর্তা বলেন, শিলাবৃষ্টির আঘাতে ধানের শিষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ফলন হ্রাসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের কাজ চলমান রয়েছে।

