মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখনো সবুজের ছোঁয়া। তবে সেই সবুজের আড়ালে লুকিয়ে আছে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস। চলতি মৌসুমে পেঁয়াজ ও রসুনের ভালো ফলন হলেও বাজারে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় হাসি ফুটেনি কৃষকের মুখে। এর মধ্যে ঈদের পর টানা বৃষ্টিতে রসুন খেতেও দেখা দিয়েছে পচন, যা নতুন করে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে কৃষকদের।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মাঠে এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পেঁয়াজ ও রসুনের ফলন ছিল আশানুরূপ। বাম্পার ফলনের আশা নিয়ে কৃষকরা জমিতে শ্রম, সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু ফসল ঘরে তোলার সময় এসে বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষকই লোকসানের মুখে পড়েছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও বাজারে পেঁয়াজের দাম এতটাই কম যে খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেকেই ধার-দেনা করে চাষাবাদ করেছেন। ফলে এবার কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে ঋণের বোঝা আরও বাড়বে বলে শঙ্কা করছেন তারা।
এরই মধ্যে ঈদের পর টানা বৃষ্টিতে মাঠে থাকা রসুনে পচন ধরতে শুরু করেছে। সাধারণত রসুন তুলে শুকিয়ে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হলেও এবারের আবহাওয়া সেই সুযোগ অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে। দ্রুত রসুন তুলতে না পারলে পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান কৃষকরা।
তবে রসুন তুলতেও দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। কৃষকরা জানান, বর্তমানে তীব্র শ্রমিক সংকটের কারণে সময়মতো ফসল তুলতে পারছেন না তারা। আগে যেখানে একজন শ্রমিকের মজুরি ছিল ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা, এখন সেখানে প্রায় দ্বিগুণ মজুরি গুনতে হচ্ছে। একসঙ্গে অধিকাংশ কৃষক রসুন তোলায় শ্রমিকের চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
ফলে অনেক ক্ষেত্রেই জমি থেকে রসুন তুলে সঠিকভাবে শুকানো ও প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে মাঠেই পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান ফসল। কৃষকদের ভাষ্য, একদিকে শ্রমিকের বাড়তি খরচ, অন্যদিকে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা—দুই দিক থেকেই তারা চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
শুধু উৎপাদন বা শ্রমিক সংকটই নয়, বাজারজাতকরণেও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা। জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পাইকাররা আগের মতো মাঠে এসে ফসল কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এতে কৃষকদের নিজ খরচে ফসল বাজারে নিতে হচ্ছে, যা তাদের বাড়তি আর্থিক চাপের মধ্যে ফেলছে।
কৃষকদের অভিযোগ, মাঠ থেকে হাট-বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়লেও সে অনুযায়ী দাম মিলছে না। ফলে ভালো ফলনও তাদের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে উল্টো দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও কৃষকরা থেমে নেই। পেঁয়াজ ও রসুন কাটার পর একই জমিতে পাট চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। নতুন আশায় বুক বেঁধে অনেকেই মনে করছেন, পাটের ফলন ও বাজারদর ভালো হলে কিছুটা হলেও এবারের লোকসান কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতে পারে।
তবে সেখানেও জ্বালানি সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাক্টর চালিয়ে জমি প্রস্তুত করতে তেল না পাওয়ায় অনেক কৃষক সময়মতো জমি চাষ করতে পারছেন না। এতে পাটের আবাদও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
স্থানীয় কৃষক কালাম বেপারী বলেন, আগে যে জমি চাষ করতে ২ হাজার টাকা লাগত, এখন ৪ হাজার টাকাতেও ট্রাক্টর পাওয়া যাচ্ছে না। তবুও আশা ছাড়ি নাই। পাটে ভালো কিছু হলে হয়তো কিছুটা টিকে থাকতে পারব।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলিমুজ্জামান বলেন, পেঁয়াজ ও রসুনের দাম কমে যাওয়ায় কৃষকদের বিকল্পভাবে সবজি চাষে আগ্রহী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি এবার পাটের ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকদের স্বার্থে কৃষি বিপণন কর্মকর্তার সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে।
শিবচরের মাঠে এখন যেন এক অদ্ভুত বাস্তবতা—একদিকে প্রকৃতির অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে বাজারের নির্মমতা। ঘামে ভেজা মাটিতে ফলন ফলিয়েও যদি কৃষক তার ন্যায্য মূল্য না পান, তবে সেই পরিশ্রম কেবলই বেদনার গল্প হয়ে ওঠে।
বৃষ্টি, বাজারদর, শ্রমিক সংকট ও জ্বালানি দুর্ভোগ—এই চার দিকের চাপে পড়ে শিবচরের কৃষকরা এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছেন। কৃষি নির্ভর এ অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা, দ্রুত বাজার স্থিতিশীলতা, সহজ জ্বালানি সরবরাহ ও কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হলে তবেই ফিরতে পারে কৃষকের মুখের হারানো হাসি।
-20260330103908.webp)
-20260330110827.webp)

