× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম

স্বাস্থ্যসেবার অভাবে মানবেতর জীবন চরাঞ্চলের হাজারো মানুষের

শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

দেশের কৃষি, মৎস্য ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে চরম অবহেলার শিকার মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ। পদ্মা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরজানাজাত ইউনিয়নের দুটি দুর্গম চরে প্রায় চার বছর ধরে বসবাস করছেন প্রায় দুই হাজার মানুষ। অথচ তাদের জন্য নেই কোনো হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক কিংবা স্থায়ী চিকিৎসক। ফলে সামান্য অসুস্থতা থেকে শুরু করে প্রসূতি সেবা—সব ক্ষেত্রেই সীমাহীন দুর্ভোগের মুখোমুখি হচ্ছেন চরবাসী।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পদ্মার বিশাল জলরাশি পাড়ি দিয়েই চরাঞ্চলের মানুষের একমাত্র যাতায়াত। খেয়া নৌকাই যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল হলেও ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাবে তাদের জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে কাটছে।

স্থানীয়রা জানান, চরে কোনো সরকারি বা বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। এমনকি প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যও কোনো ওষুধ সরবরাহ করা হয় না। ফলে সাধারণ রোগেও মানুষকে ঝাড়ফুঁক, কবিরাজ কিংবা অনভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। আর গুরুতর রোগী হলে একমাত্র ভরসা শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সেখানে পৌঁছাতে নদীপথে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে।

জানা গেছে, চরজানাজাত ইউনিয়নের ভূমিহীন এলাকা ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পরে ২০২১ সালে পদ্মার বুকে নতুন চর জেগে ওঠে। ২০২২ সাল থেকে সেখানে আবার বসতি গড়ে ওঠে। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার মানুষের বসবাস হলেও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে তারা সম্পূর্ণ বঞ্চিত।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিকূল আবহাওয়া, নদীর তীব্র স্রোত ও নৌযানের সংকটের কারণে অনেক সময় জরুরি রোগীকেও হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। বিশেষ করে রাতের বেলায় রোগী নিয়ে নদী পার হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য কোনো নৌ-অ্যাম্বুলেন্সও নেই।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্করা। গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব কিংবা নবজাতকের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অনেক নারী বাধ্য হয়ে বাড়িতেই সন্তান প্রসব করছেন। এতে মা ও নবজাতকের জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া, জ্বর ও অপুষ্টির প্রকোপও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

চরের বাসিন্দা জুলেখা বেগম বলেন, চরের জীবন খুবই কষ্টের। এখানে চিকিৎসক নেই, স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, কমিউনিটি ক্লিনিকও নেই। গত মাসে আমার প্রসববেদনা উঠলে রাতে কোনো নৌকা পাওয়া যায়নি। অনেক কষ্টে ভোরে নদী পার হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে। মাঝরাতে কিছু হলে হয়তো বাঁচতাম না। আমরা দ্রুত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক চাই।

দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভোগা জব্বার মোল্লা বলেন, হঠাৎ অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নদী পার হতে সময় লাগে, ততক্ষণে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। কত জনপ্রতিনিধি হাসপাতাল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু আজও কোনো বাস্তবায়ন হয়নি।

দুই সন্তানের জননী তাসলিমা সালমা বিবি বলেন, আমার ছেলের জ্বর বা ডায়রিয়া হলে খুব ভয় লাগে। এখানে কোনো ডাক্তার নেই, ওষুধও পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে কবিরাজের কাছে যেতে হয়। চরে যদি একটি ভালো চিকিৎসাকেন্দ্র থাকত, তাহলে এত কষ্ট হতো না।

স্থানীয় বাসিন্দা নাসির উদ্দিন বেপারী বলেন, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু আমরা সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত। এখানে চিকিৎসকসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন এখন সময়ের দাবি।

ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোতালেব বেপারী বলেন, চরে সরকার এখনো কোনো স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারেনি। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যায় না। দ্রুত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালুর ব্যবস্থা করা জরুরি।

এ বিষয়ে মাদারীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মতিউর রহমান বলেন, উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও জনবলের সংকটের কারণে দুর্গম চরাঞ্চলে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে বর্তমানে উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার সপ্তাহে দুই দিন স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন। এছাড়া নতুন চরে মাসে অন্তত একদিন চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, প্রসূতি মায়েদের নিরাপদ মাতৃত্ব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি স্থায়ী কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের জন্য সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ৩০ শতাংশ জমি প্রয়োজন। ইউএনও কমিটির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া গেলে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চরবাসীর দাবি, দীর্ঘদিনের অবহেলার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত একটি স্থায়ী কমিউনিটি ক্লিনিক, পর্যাপ্ত চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালু করা হোক। তাদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হলে চরাঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবনযাত্রার মান যেমন উন্নত হবে, তেমনি কমে আসবে প্রসূতি, শিশু ও বয়স্কদের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকিও।

Link copied!