টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যা রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। নদী-ছড়া ও খাল উপচে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও বিভিন্ন খামারে। এই দুর্যোগে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন উপজেলার ৩ নম্বর বাঙ্গালহালিয়া ইউনিয়নের ডাকবাংলাপাড়া এলাকার তরুণ খামারি মোহাম্মদ সাদেক। বন্যার পানিতে তার পোল্ট্রি খামারের প্রায় ১ হাজার ৫০০টি ব্রয়লার মুরগি মারা গেছে। এতে তার প্রায় পাঁচ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার সরেজমিনে ডাকবাংলাপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, খামারের চারপাশে এখনো বন্যার পানির চিহ্ন স্পষ্ট। খামারের মেঝেতে কাদা জমে আছে। কোথাও কোথাও মৃত মুরগির পালক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কয়েক দিন আগেও যেখানে হাজারো মুরগির ডাক শোনা যেত, সেখানে এখন নীরবতা। খামারের ভেতরে দাঁড়িয়ে হতাশ চোখে নিজের ক্ষতির হিসাব কষছেন মোহাম্মদ সাদেক।
খামার সূত্রে জানা যায়, কয়েক মাস আগে বিপুল ব্যয়ে খামারটি প্রস্তুত করা হয়। সেখানে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি ব্রয়লার মুরগি লালন-পালন করা হচ্ছিল। প্রতিটি মুরগির গড় ওজন ছিল প্রায় ১ কেজি ২০০ গ্রাম। আর কয়েক দিনের মধ্যেই মুরগিগুলো বাজারে বিক্রি করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তার আগেই টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে হঠাৎ করে খামারে পানি ঢুকে পড়ে। অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো খামার পানিতে তলিয়ে যায়। পরিস্থিতি এতটাই দ্রুত অবনতি ঘটে যে মুরগিগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাননি খামার মালিক। ফলে একে একে সব মুরগি মারা যায়।
খামার মালিক মোহাম্মদ সাদেক বলেন, এই খামারই ছিল আমার পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। ব্যাংক ঋণ, ধারদেনা এবং নিজের জমানো টাকা দিয়ে অনেক কষ্ট করে খামারটি গড়ে তুলেছিলাম। মুরগিগুলো বিক্রির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বন্যার পানি সব শেষ করে দিল। প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন ঋণ কীভাবে পরিশোধ করব, পরিবার কীভাবে চলবে—সেটাই সবচেয়ে বড় চিন্তা।
তিনি আরও বলেন, এভাবে সব হারিয়ে আমি সম্পূর্ণ অসহায়। আমি এখন নিঃস্ব, সর্বশান্ত। সরকার কিংবা কোনো বিত্তবান মানুষ যদি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, তাহলে হয়তো আবার নতুন করে খামার শুরু করতে পারব।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ি ঢল নেমে এলাকার খাল ও ছড়াগুলো দ্রুত ফুলে-ফেঁপে ওঠে। এরপর বন্যার পানি নিম্নাঞ্চলে প্রবেশ করে। অনেক বসতবাড়িতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি ওঠে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষিজমি, মাছের ঘের ও পোল্ট্রি খামার। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।
ডাকবাংলাপাড়ার বাসিন্দাদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন আকস্মিক বন্যা খুব কমই দেখা গেছে। পানি এত দ্রুত বেড়েছিল যে, মানুষ ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে পারেনি। সাদেকের খামারটি ছিল এলাকার অন্যতম বড় ব্রয়লার খামার। সেটি মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়রাও মর্মাহত।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, কৃষক ও খামারিদের তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে। ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে সরকারি সহায়তা পান, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে চলমান বন্যায় রাজস্থলী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেক ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন খামারিরা। দুর্যোগ কেটে গেলেও ক্ষতিগ্রস্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সময় লাগবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই আঘাতে মোহাম্মদ সাদেকের মতো অনেক ক্ষুদ্র খামারি এখন নতুন করে বাঁচার পথ খুঁজছেন। তাদের দাবি, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন করে দ্রুত সরকারি আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে তারা আবারও উৎপাদনে ফিরতে পারবেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন