ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

প্রিয় ইরফান, আমি তোমাকে ভালোবাসি

জুবায়ের দুখু
প্রকাশিত: এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ০৮:১৪ পিএম
নাম তার ইরফান খান। ছবি : সংগৃহীত

নাম তার ইরফান খান। প্রথম যিনি তার সিনেমা বা অভিনয় দেখেছেন, তার প্রেমে পড়েননি—এমন মানুষ খুবই কম। আমি ইরফানকে প্রথম দেখি হিন্দি মিডিয়াম সিনেমার মাধ্যমে। এরপরই আমি তার প্রথম সারির একজন ভক্ত হয়ে উঠি। তারপর একে একে তার আরও অনেক সিনেমা দেখা হয়। ধীরে ধীরে আমি তার প্রেমে পড়ে যাই।

‘ইন ট্রিটমেন্ট’ দেখার সময় এই আকর্ষণের শুরু—যখন তিনি বিষণ্ণ, আর একটি সিগারেট ধরাতে তার চার মিনিট সময় লাগে।

‘দ্য নেমসেক’ দেখার সময় সেই আকর্ষণ আরও গভীর হয়। আর তারপর যখন আমি ‘লাইফ অব পাই’ দেখলাম, তিনি আমাকে কাঁদিয়ে দিলেন। চোখ মুছতে মুছতে তখন বুঝলাম কী ঘটছে- আমি একজন অভিনেতার সত্যিকারের প্রেমে পড়ে গেছি।

‘দ্য লাঞ্চবক্স’ দেখার পর তিনি আমাকে পুরোপুরি কাবু করে ফেলেন। রিতেশ বাত্রা পরিচালিত এবং মাইকেল সিমন্ডসমাইকেল সিমন্ডসের চিত্রায়ণে নির্মিত এই সিনেমাটিতে জনাব খানকে দেখা যায় এক নিঃসঙ্গ, অন্তর্মুখী অফিসকর্মী হিসেবে।

তিনি একটি ডেলিভারি সার্ভিস থেকে প্রতিদিন ভুল লাঞ্চবক্স পেতে শুরু করেন। শহরের কেন্দ্রে থাকা এক একাকী গৃহবধূ, যিনি একজন রাঁধুনি, তার সঙ্গে নোট আর চিঠির মাধ্যমে একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারা কি কখনো সামনাসামনি দেখা করবে? আর দেখা করা কি উচিত?

স্থিরতারই ইরফান

যদি কারো ভেতরে সত্যিকারের স্থিরতা থাকে, তবে তাকে সহজেই আগ্নেয়াস্ত্রের মতো শক্তিশালী বলা যায়। সেই মানুষটিই আমার প্রিয় অভিনেতা ইরফান খান। তিনি স্থিরতার এক অনন্য সাধক, বরং বলা যায়- এর একজন মাস্টার।

জনাব খানের এই বিশেষ স্থিরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তার বিশাল, ভেজা, কালো চোখ দুটিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার সুযোগ করে দেয়। তিনি কোনো কিছুর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে অসাধারণ দক্ষ।

যখন তিনি তাকিয়ে থাকেন, তিনি তার আবেগগুলোকে গুলিয়ে ফেলেন না। তার ভেতরে আপনি সব অনুভূতি একসঙ্গে দেখবেন না—বিষণ্ণতা, ক্লান্তি, হতাশা, বিরক্তি, অনুশোচনা, বিস্ময়—এসব তিনি আলাদা আলাদাভাবে প্রকাশ করেন। অথচ এই প্রতিটি অনুভূতি এমনভাবে আপনাকে ছুঁয়ে যায়, যেন সেগুলো থেকে বেরিয়ে আসা অসম্ভব।

বিষণ্ণতার মেঘ দেখতে হলে তার নিশ্চল মুখের আড়ালে তাকাতে হয়। ক্লান্তি খুঁজতে গেলে তার মুখের আর্দ্রতায় সহজেই ধরা পড়ে—তবু তা কখনো আপনাকে ক্লান্ত করে না। বিরক্তি বোঝা যায় তার প্রায় অদৃশ্য শ্বাস নেওয়ার ভঙ্গিতে, আর অনুশোচনা ধরা দেয় এক শান্ত নিঃশ্বাসে।

তিনি কিছু না বললেও অনেক কিছু বলে ফেলেন। আপনি তার প্রতিটি বিচ্ছিন্ন চিন্তাকে নিজের ভেতরে প্রতিধ্বনিত হতে শুনতে পারেন যখন আপনি তার কোনো অভিনয়ে মত্ত হবেন।

আর যখন তিনি নড়াচড়া করেন- ওহ, কী অসাধারণভাবেই না করেন!

‘দ্য লাঞ্চবক্স’ আমাদের, অর্থাৎ ‘ইর-ফ্যানদের’, প্রায় দশটি অবিচ্ছিন্ন মাস্টার শট উপহার দেয়- যেখানে সেই মহান নিশ্চল মানুষটিকে শুধু দুপুরের খাবার খেতে দেখা যায়।

তিনি লাঞ্চ ব্যাগের জিপ খোলেন, ব্যাগটি সরিয়ে রাখেন, লাঞ্চবক্সের দিকে তাকান, হাতলের ক্লিপ খুলে ফেলেন। গন্ধ শোঁকেন। ভাবেন। আবার তাকান। প্রথম ট্রেটি খোলেন- পরীক্ষা করেন। দ্বিতীয়টি খোলেন- বুঝতে পারেন সেটি কী। তৃতীয়টি দেখেন, তারপর চতুর্থটি। সবগুলো পাশাপাশি সাজিয়ে রাখেন। চারপাশে তাকান। আবার গন্ধ শোঁকেন। একটু ইতস্তত করেন।

তারপর প্রথম খাবারে চামচ ঢোকান। সাবধানে প্লেটে রাখেন। দ্বিতীয় খাবার থেকে কিছুটা তুলে নেন। কাছে রাখেন।

এভাবেই ধাপে ধাপে এগোয় সবকিছু- ছোট ছোট অঙ্গভঙ্গিতে।

অবশেষে…

তিনি চামচটি ঠোঁটের কাছে আনেন এবং… এক কামড় দেন।

তিনি হাসেন না। নড়েন না। কিছুই করেন না।

তবু তার সেই বিশাল, ভেজা, কালো, বিষণ্ণ, জ্ঞানী, নিঃসঙ্গ চোখ দুটির ভেতরে- আমরা আলোর এক সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখতে পাই।

মনে হয়, তার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেছে।