ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বিশ্ববাজারে কমছে বাংলাদেশি পোশাকের দাম, বেড়েছে ভারতের

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: মার্চ ২৩, ২০২৬, ০২:১৯ পিএম
ছবি- সংগৃহীত

বিশ্ববাজারে পোশাক খাতে প্রতিযোগিতা দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে, আর সেই প্রতিযোগিতায় ক্রমেই চাপে পড়ছে বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক তথ্য ও বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজার—বিশেষ করে ইউরোপে—বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো তাদের অবস্থান শক্তিশালী করছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের গড় দাম কমেছে প্রায় ৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অথচ একই সময়ে ভিয়েতনামের পোশাকের দাম বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ, ভারতের প্রায় ২ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার ১৪ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ, যেখানে অন্যান্য দেশ মূল্য বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে উল্টো কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে।

এ পরিস্থিতি শুধু দামের ক্ষেত্রেই নয়, রপ্তানি আয়ের দিক থেকেও প্রভাব ফেলছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে পোশাক খাতে রপ্তানি আয় কমেছে ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। একই সময়ে কাঁচামাল আমদানির জন্য খোলা ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ, যা উৎপাদন ও সরবরাহ চেইনে ধীরগতির ইঙ্গিত দেয়। এর প্রভাব পড়েছে প্রধান বাজারগুলোতেও—যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১ শতাংশ এবং ইউরোপে ২৫ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং মার্কিন শুল্কনীতির প্রভাবও এই সংকটকে তীব্র করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো—বিশেষ করে দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক রপ্তানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে কারখানা সচল রাখা এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ধরে রাখতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের কম দামে অর্ডার নিতে বাধ্য হতে হচ্ছে।

রপ্তানিকারকদের মতে, বিশ্বব্যাপী দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে পোশাকের চাহিদায়। অর্ডার কমে যাওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অনেকেই কম লাভে বা কখনও লোকসানেও পণ্য বিক্রি করছেন। এতে দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের টেকসই উন্নয়ন হুমকির মুখে পড়তে পারে।

অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশের উৎপাদন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে আমদানি করা কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করা হয়, কিন্তু ভবিষ্যতে শুল্ক সুবিধা ধরে রাখতে ‘টু-স্টেজ কনভার্শন’ শর্ত পূরণ করতে হবে—অর্থাৎ সুতা ও কাপড় উভয়ই দেশে উৎপাদন করতে হবে। এ জন্য স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইউরোপের মোট পোশাক আমদানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় সাড়ে ১৫ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ, সামগ্রিক বাজারই সংকুচিত হচ্ছে, যার মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে উঠছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশি পোশাক খাত এখন এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি—একদিকে বৈশ্বিক চাহিদা কমছে, অন্যদিকে প্রতিযোগীরা শক্তিশালী অবস্থান নিচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, কাঁচামালে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং বাজার বৈচিত্র্য আনার মতো কৌশলগত পদক্ষেপ।