ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

জাপানের সহায়তায় স্বল্পমেয়াদি ও বন্যা-সহনশীল ধান চাষে সাফল্য

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মার্চ ২৮, ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম
ছবি- সংগৃহীত

বাংলাদেশের হাওর অঞ্চল দেশের অন্যতম কৃষিপ্রধান এলাকা। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার হাওরাঞ্চলে কৃষকদের জীবিকা সুরক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ সাফল্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এসেড হবিগঞ্জের এনরিচ প্রকল্পের আওতায় জাপানের শেয়ার দ্য প্লানেট অ্যাসোসিয়েশন এবং জাপান ফান্ড ফর গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট (জেএফজিই)-এর আর্থিক সহায়তায় আশার আলো দেখা যাচ্ছে। উপজেলার পূর্ব পাগলা ও পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নে ৮টি প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে বন্যা-সহনশীল, স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত চাষ করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই অঞ্চল ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আকস্মিক আগাম বন্যা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে প্রায়ই বোরো মৌসুমের ধান পরিপক্ব হওয়ার আগেই নষ্ট হয়ে যায়।

ফলে কৃষকরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন এবং খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। এই বাস্তবতায় আগাম বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় উপযোগী উন্নত ধানের জাত সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রকল্পের আওতায় মোট ৮ জন কৃষকের মাধ্যমে ৮টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি প্লটের আয়তন প্রায় ১ বিঘা। এসব প্লটে ইজজও ধান-৬৭, ইজজও ধান-৯২ এবং ইজজও ধান-১০৮ জাতের চাষ করা হচ্ছে।

এগুলো হাওর অঞ্চলের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। এসব প্লট শুধু চাষাবাদের ক্ষেত্র নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার ক্ষেত্র হিসেবেও কাজ করছে, যেখানে স্থানীয় কৃষকরা সরাসরি ফলন, বৃদ্ধি ও সহনশীলতা পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন।

এই উদ্যোগে অংশগ্রহণকারী কৃষকদের মধ্যে রয়েছেন সাদিক মিয়া, বেণু রঞ্জন দাস, মতিউর রহমান, আব্দুস সাবুর, মনিন্দ্র সূত্রধর, জাবেদ নূর, আবু মিয়া এবং রোশন আলী। তাদের জমিতে ধানের উন্নত বৃদ্ধি ও ফলনের সম্ভাবনা দেখে আশপাশের কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বেড়েছে। অনেক কৃষক নিয়মিত এসব প্লট পরিদর্শন করে ধানের বৃদ্ধি, শীষের গঠন এবং রোগ-পোকার প্রতিরোধ ক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করছেন।

প্রদর্শনী প্লট স্থাপনের আগে কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এতে জমি প্রস্তুতি, উন্নত বীজ নির্বাচন, চারা উৎপাদন, সঠিক দূরত্বে রোপণ, সুষম সার প্রয়োগ এবং রোগ-পোকা দমন পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রকল্পের মাঠকর্মীরা নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে কৃষকদের সমস্যা সমাধান ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করছেন।

প্রবর্তিত ধানের প্রতিটি জাতেরই বিশেষ সুবিধা রয়েছে। ইজজও ধান-৬৭ প্রায় ১৪৫-১৫০ দিনে পরিপক্ব হয়, যা কৃষকদের আগাম বন্যার আগে ফসল কাটার সুযোগ দেয়। ইজজও ধান-৯২ প্রায় ১৫৬-১৬০ দিনে পরিপক্ব হয়ে অধিক ফলন প্রদান করে, কারণ এর শীষ বড় এবং ধানের সংখ্যা বেশি।

অন্যদিকে ইজজও ধান-১০৮ একটি স্বল্পমেয়াদি জাত, যার গাছ মজবুত, হেলে পড়ার ঝুঁকি কম এবং রোগ-পোকার আক্রমণ তুলনামূলক কম। ফলে নিরাপদ ফলনের সম্ভাবনা বেশি।

অংশগ্রহণকারী কৃষকদের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত ইতিবাচক। তারা জানিয়েছেন, আগের তুলনায় ধানের বৃদ্ধি ভালো হচ্ছে এবং সময়মতো ফসল ঘরে তোলার আশা বেড়েছে। প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে তারা আধুনিক কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছেন, যা ভবিষ্যতে বৃহৎ পরিসরে এই জাতগুলো চাষে উৎসাহ জোগাবে।

এসেড হবিগঞ্জের কর্মকর্তাদের মতে, হাওর অঞ্চলের জন্য স্বল্পমেয়াদি ও বন্যা-সহনশীল ধানের জাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত বীজের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত কারিগরি সহায়তা কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণে সহায়তা করছে এবং তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে।

ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হলে হাওর অঞ্চলের কৃষকরা আরও নিরাপদভাবে ফসল উৎপাদন করতে সক্ষম হবেন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।