আজকাল লিভারকে ‘পরিষ্কার’ বা ডিটক্স করার জন্য বাজারে নানা ধরনের হারবাল পণ্য পাওয়া যায়। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখে পড়ে এসব পণ্যের অসংখ্য বিজ্ঞাপন। বিটরুট, আমলকি, হলুদের গুঁড়া ইত্যাদিকে লিভার পরিষ্কারের বিশেষ উপায় হিসেবে প্রচার করা হয়। অনলাইনে এসব পণ্যের বিক্রি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার নতুন বিষয় নয়। প্রাচীনকাল থেকেই ওষুধে নানা ধরনের প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে বর্তমানে যে পদ্ধতিতে এসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে, তাতে চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ এবং হারবাল পণ্যের বিশেষজ্ঞরাও এর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহীন।
লিভার কি সত্যিই টক্সিন সরাতে সক্ষম? নাকি এসব হারবাল পণ্য শরীরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেই এই প্রতিবেদনে আলোচ্য বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
লিভারের গুরুত্ব
লিভার পেটের ডান পাশে অবস্থিত এবং প্রায় ৫০০-এরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করে। এটি আমাদের শরীরের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর মধ্যে একটি। লিভার অ্যালকোহল, ওষুধ ও বর্জ্য পদার্থ ফিল্টার করে, খাবার থেকে পুষ্টি প্রক্রিয়াজাত করে, ভিটামিন ও খনিজ সঞ্চয় করে, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং হজম প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে। এত দায়িত্বের কারণে লিভার ডিটক্সের প্রতি মানুষের আগ্রহ স্বাভাবিক।
সম্প্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন মানুষ লিভারের রোগে আক্রান্ত। এই পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে, লিভারকে ‘ডিটক্স’ করার দাবি করা পণ্য ও প্রোগ্রামের সংখ্যা বাড়ছে। তবে এর বাস্তবতা কী, তা আলাদা বিষয়।
লিভার ডিটক্স কী?
লিভার ডিটক্স বা লিভার ক্লিনজ বলতে এমন প্রক্রিয়া বা পণ্যকে বোঝায় যা লিভারকে বিষাক্ত পদার্থ থেকে মুক্ত করে, এর কার্যকারিতা বাড়ায় এবং ওজন কমানো বা স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানোর মতো সুবিধা দেয়। এটি হতে পারে ভেষজ সম্পূরক, জুস উপবাস, লেবু, দুধথিসল, হলুদ বা আপেল সিডার ভিনেগারের মতো উপাদানযুক্ত সীমিত খাদ্যাভ্যাস বা পানীয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, লিভার প্রতিদিনই স্বাভাবিকভাবে শরীরকে বিষমুক্ত করে। এটি অ্যালকোহল, ওষুধ, রাসায়নিক ও প্রাকৃতিক বর্জ্য পদার্থ প্রক্রিয়াজাত করে, যা শরীর থেকে নিরাপদে বের হয়। অধিকাংশ মানুষের জন্য লিভারের এই কাজের জন্য অতিরিক্ত সাহায্যের প্রয়োজন হয় না।
লিভার ডিটক্স কার্যকর কি?
লিভার স্বাভাবিকভাবেই বিষাক্ত পদার্থ নির্মূল করে প্রস্রাব বা পিত্তের মাধ্যমে। কিছু পণ্য দাবি করে এগুলো লিভারের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করে বা উন্নতি ঘটায়, কিন্তু বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এমনকি কিছু ডিটক্স পণ্য ক্ষতিকরও হতে পারে, বিশেষত যদি এতে নিয়ন্ত্রণহীন ভেষজ উপাদান থাকে বা অত্যন্ত সীমিত খাদ্যাভ্যাসে উৎসাহ দেওয়া হয়, যা শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত করে। দীর্ঘমেয়াদী রোগ যেমন কিডনি সমস্যা বা রক্তচাপ থাকলে এই ধরনের ডিটক্স আরও ক্ষতি করতে পারে।
ডিটক্সে থাকা কিছু উপাদান যেমন দারুচিনি বা আদা সামান্য স্বাস্থ্যগত সুবিধা দিতে পারে, তবে পণ্যে এদের পরিমাণ যথেষ্ট নয়।
লিভারের ক্ষতি রোধে ডিটক্স সহায়তা করে কি?
লিভার ডিটক্স প্রোগ্রাম লিভারের ক্ষতি প্রতিরোধ করে না এবং লিভারের রোগের চিকিৎসা করে না। বরং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে সমর্থন করতে পারে। লিভারের ক্ষতির প্রধান কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদী অ্যালকোহল সেবন, স্থূলতা, খারাপ খাদ্যাভ্যাস, ভাইরাল সংক্রমণ, পরিবেশগত বিষাক্ত পদার্থ, কিছু জেনেটিক অবস্থা এবং নির্দিষ্ট ওষুধ ও সম্পূরকের অতিরিক্ত ব্যবহার।
লিভারের ক্ষতির লক্ষণসমূহ
লিভারের সমস্যা সাধারণত ধীরে ধীরে বিকশিত হয় এবং প্রাথমিক অবস্থায় সহজে শনাক্ত হয় না। তবে কিছু লক্ষণ হতে পারে-
যেমন- অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দ্য, বমি বা হজমে অস্বস্তি, প্রস্রাব বা মলের রঙের পরিবর্তন, ত্বক বা চোখের হলদে ভাব, পেট বা পায়ের ফোলা, ত্বকের চুলকানি, সহজে ক্ষত হওয়া- এই ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ডিটক্স ছাড়া লিভার সুস্থ রাখার উপায়
ডিটক্স বা সীমিত খাদ্যের পরিবর্তে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে লিভারের জন্য কার্যকর-
১. সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ- শাকসবজি, বেরি, গোটা শস্য, চর্বিহীন প্রোটিন যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং প্রয়োজনীয় ভিটামিন সরবরাহ করে।
২. অ্যালকোহল সীমিত করা- লিভারের উপর চাপ কমাতে অ্যালকোহল কমানো বা পুরোপুরি এড়িয়ে চলা।
৩. পর্যাপ্ত জল পান- প্রতিদিন কমপক্ষে আট কাপ জল পান করা।
৪. নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম- লিভারে চর্বি জমা কমাতে সাহায্য করে।
৫. অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও সম্পূরক এড়িয়ে চলা- ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ভেষজ বা অন্যান্য সম্পূরক গ্রহণ না করা।
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন