ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

যে গ্রামে একটি বাড়িতেও নেই দরজা

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৫, ২০২৬, ০৮:৪০ পিএম
গ্রামের একটি বাড়ি। ছবি : সংগৃহীত

শত শত বাড়ি নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি গ্রাম। কিন্তু এত এত বাড়ি থাকা সত্ত্বেও কোনো বাড়িতেই নেই দরজা। একবার ভাবুন—বাড়ি আছে, কিন্তু দরজা নেই! তাহলে কি চোরেরা সবকিছু নিয়ে যাবে? স্বাভাবিকভাবেই উত্তর হবে ‘হ্যাঁ’। তবে গ্রামবাসীর উত্তর শুনলে আপনিও অবাক হবেন।

হ্যাঁ, এমনই একটি গ্রামের কথা বলছি, যে গ্রামে বাড়ির যে অংশে দরজা থাকার কথা, সেই জায়গাটি পুরোপুরি খোলা। এই গ্রামের প্রতিটি বাড়িই একই রকম।

প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক আসেন শুধু এই গ্রামটি দেখার জন্য। কথিত আছে, বছরের পর বছর দরজা ছাড়া বসবাস করলেও এখানে কোনো চুরি বা ডাকাতির ঘটনা ঘটে না।

উপরের কথাগুলো বিস্ময়কর মনে হলেও এটি আসলে বাস্তবিক। এই গ্রামটি ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যে অবস্থিত, যার নাম শনি শিংনাপুর।

এই গ্রামের বহু বাড়িতে সোনা, গয়না, টাকা-পয়সা ইত্যাদি রয়েছে। তবুও বাড়িগুলো খোলা থাকলেও কোনো কিছুই চুরি বা হারিয়ে যায় না। যেমন রাখা হয়, তেমনই থাকে দিনের পর দিন।

এ ছাড়া এই গ্রামে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নেই। এমনকি বাড়িতে দরজা না থাকার পরেও কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

অথচ আজ পর্যন্ত কোনো দিন এক কানাকড়িও চুরি হয়নি। এখানকার মানুষ তালা ছাড়াই দিব্যি সুখে জীবনযাপন করছেন। কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেন না যে তাদের কোনো কিছু চুরি যেতে পারে।

কেন দরজার প্রয়োজন পড়ে না?

এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে প্রায় ৩০০ বছর পেছনে যেতে হবে। সময়টা বর্ষাকাল। গ্রামের মানুষ গিয়েছিলেন পাঁশনালা নদীর ধারে। কারণ ভারী বর্ষায় নদীর জল ভেতর থেকে উঠে এসেছিল একটি বিশাল কালো পাথর।

গ্রামবাসীরা যখন পাথরটি ছুঁয়ে দেখেন, তখন পাথর থেকে চুইয়ে চুইয়ে রক্তের মতো তরল বের হতে থাকে। প্রচলিত আছে সেই রাতেই গ্রামের প্রধান একটি স্বপ্ন দেখেন। তিনি দেখেন, শনি দেব পাথরের রূপ ধরে তাদের গ্রামে এসেছেন।

স্বপ্নে শনি দেব জানান, তিনি গোটা গ্রামকে রক্ষা করবেন। সেই থেকে এই পাথরটিকে শনি দেবের প্রতীক হিসেবে মানা হয়।

তবে দরজা কেন খোলা থাকে? বলা হয়, স্বপ্নাদেশে শনি দেব নির্দেশ দেন যে তাকে কোনো বন্ধ জায়গায় রাখা যাবে না। খোলা জায়গায় রাখতে হবে, যাতে তিনি সকলের মঙ্গল করতে পারেন। সেই বিশ্বাস থেকেই মানুষ বাড়ির দরজা খুলে রাখতে শুরু করে।

তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, কোনো সমস্যা এলেও শনি দেব তাদের রক্ষা করবেন।

সেই থেকে শুরু আজও গ্রামজুড়ে এই বিশ্বাস এখনো অটুটভাবে টিকে আছে। এখানকার মানুষ বিশ্বাস করেন, কেউ চুরি বা ডাকাতি করার চেষ্টা করলে তার চোখ অন্ধ হয়ে যাবে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালেও এই গ্রামের কোনো বাড়িতেই দরজা ছিল না। এমনকি ২০১১ সালে গ্রামে একটি ব্যাংকও খোলা হয়, যেখানে সামান্য তালা-চাবির ব্যবহার করা হতো।

তবে বর্তমানে শোনা যাচ্ছে, কিছু পরিবার গ্রামের মোড়লের কাছে অনুমতি চেয়ে নিজেদের বাড়িতে দরজা বসাতে চাইছে। হয়তো ৩০০ বছরের এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে।