সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে রাজধানীর ভূমিকম্প ঝুঁকি। বিশেষ করে কয়েকটি ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ঢাকার খুব কাছাকাছি হওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
সর্বশেষ সোমবার (২২ জুন) রাত ৮টা ২৮ মিনিটে অনুভূত ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৪ দশমিক ৪। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এর উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে। এর আগে চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৩ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছিল, যা রাজধানীর নিকটবর্তী ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে অন্যতম।
এরও আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে নরসিংদী এলাকায় ৫ দশমিক ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। গত কয়েক দশকে দেশের অভ্যন্তরে উৎপন্ন হওয়া উল্লেখযোগ্য শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে এটি একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। ওই কম্পনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একই এলাকায় আরও কয়েকটি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পগুলোর মাত্রার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে তাদের উৎপত্তিস্থল। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতেই বারবার কম্পনের কেন্দ্র শনাক্ত হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এগুলো কি কেবল স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফল, নাকি ভবিষ্যতের বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস?
ঢাকার কাছেই বারবার ভূমিকম্পের কেন্দ্র
সর্বশেষ ভূমিকম্পের কেন্দ্র নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে কিছু পার্থক্য দেখা গেছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, এর কেন্দ্র ছিল নরসিংদীর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এবং ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। অন্যদিকে ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি কেন্দ্রের গভীরতা ১৬ কিলোমিটার উল্লেখ করেছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায়, যা ঢাকা থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, নরসিংদী ও রূপগঞ্জের অবস্থানগত নিকটতার কারণে কেন্দ্র নির্ধারণে এ ধরনের পার্থক্য দেখা দিতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চলে সংঘটিত বেশ কয়েকটি ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল ঢাকার নিকটবর্তী এলাকায়। বিশেষ করে নরসিংদী, গাজীপুর এবং রাজধানীর আশপাশের অঞ্চলগুলোতে ধারাবাহিকভাবে কম্পন রেকর্ড হয়েছে।
২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় উৎপন্ন ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে। এতে ঢাকা, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে প্রাণহানির পাশাপাশি শত শত মানুষ আহত হন।
ওই ভূমিকম্পের পরদিন এবং পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যেই নরসিংদীর পলাশ, ঘোড়াশাল, শিবপুর এবং ঢাকার বাড্ডা এলাকায় আরও কয়েকটি ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের কেন্দ্র শনাক্ত হয়। এসব ঘটনার কারণে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষকদের নজর এখন রাজধানীর আশপাশের ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তার দিকে।
কেন হচ্ছে এসব ভূমিকম্প?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়ার মতে, সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো সক্রিয় ফল্ট লাইনের নড়াচড়া বা টেকটোনিক কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা ফল্টও পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে, আবার নতুন ফল্টেরও সৃষ্টি হতে পারে।
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে ইউরেশিয়ান, ইন্ডিয়ান ও বার্মিজ এই তিনটি টেকটোনিক প্লেটের প্রভাব রয়েছে। প্লেটগুলোর পারস্পরিক চাপ ও সংঘর্ষের কারণেই এ অঞ্চলে নিয়মিত ভূমিকম্প ঘটে।
বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা কতটা?
ভূমিকম্প গবেষক ও বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারীর মতে, ঢাকার আশপাশে সাম্প্রতিক সময়ে যে ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পগুলো হচ্ছে, সেগুলো থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ভবনধস বা ব্যাপক প্রাণহানির ঝুঁকি খুব বেশি নয়। তবে এগুলো মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির সুযোগ করে দিচ্ছে।
তার মতে, বাংলাদেশের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হলো সেইসব ফল্ট, যেগুলো অতীতে ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল এবং বগুড়ার শেরপুর অঞ্চলকে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন। ইতিহাসে এসব এলাকায় যথাক্রমে ৭ দশমিক ৬ এবং ৭ দশমিক ১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ভূমিকম্পের একটি নির্দিষ্ট পুনরাবৃত্তি চক্র বা ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ থাকে। তাই ভবিষ্যতে শক্তিশালী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা থাকলেও ঠিক কখন তা ঘটবে, সেটি নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। এটি কয়েক দশক পরেও হতে পারে, আবার তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যেও ঘটতে পারে।
তবে নরসিংদী বা ঢাকার আশপাশে সাম্প্রতিক কম্পনগুলোকে সরাসরি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হিসেবে দেখার মতো পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। কারণ এ অঞ্চলে অতীতে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের উল্লেখযোগ্য নজির নেই।
তবুও বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট ঢাকাকে ঘিরে বড় ঝুঁকি রয়েছে মূলত পার্শ্ববর্তী শক্তিশালী ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলোর কারণে। ভবিষ্যতে বড় কোনো ভূমিকম্প আঘাত হানলে প্রাণহানির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। তাই সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ ভবন নির্মাণ এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির ওপর জোর দেওয়ার বিকল্প নেই।
সূত্র: বিবিসি বাংলা


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন