× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৭, ২০২৬, ০৯:৩৫ পিএম

বন্দর চুক্তি: বন্ধ হোক অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৭, ২০২৬, ০৯:৩৫ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় সমুদ্রবন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের আমদানি–রপ্তানির প্রায় নব্বই শতাংশ কার্যক্রম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বন্দরনির্ভর। ফলে বন্দর ব্যবস্থাপনার দক্ষতা কেবল পণ্য পরিবহনের প্রশ্ন নয় বরং এটি সরাসরি জাতীয় প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত। এই বাস্তবতায় চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনায় ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে সরকারের চুক্তি স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই আলোচনা অনেক ক্ষেত্রে তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণের বদলে আবেগ, সন্দেহ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিতর্কে রূপ নিয়েছে। যা খুবই দুঃখজনক। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিতর্ক কি সত্যিই জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য, নাকি এটি উন্নয়নবিরোধী এক চেনা মানসিকতার প্রকাশ?

চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া চরে একটি আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার লক্ষ্যে ১৭ নভেম্বর ঢাকায় বাংলাদেশ সরকার ও ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির পরপরই দেশের বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ ওঠে, এই চুক্তির মাধ্যমে নাকি দেশের প্রধান বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ এটিকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি বলেও আখ্যা দেন। অথচ সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই স্পষ্টভাবে জানিয়ে আসছে, বন্দর বা টার্মিনালের মালিকানা কোনোভাবেই বিদেশিদের কাছে যাচ্ছে না। সম্পূর্ণ বিনিয়োগে এপিএম টার্মিনালস নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য টার্মিনালটি নির্মাণ ও পরিচালনা করবে। মেয়াদ শেষে অবকাঠামোসহ সবকিছু রাষ্ট্রের হাতে ফিরে আসবে।

এই চুক্তিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হলে প্রথমেই আমাদের বর্তমান বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দর দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, দীর্ঘ জাহাজ জট, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে আছে। বিশ্বব্যাপী বন্দর দক্ষতা সূচকে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান অত্যন্ত নিচের দিকে। ফলে রপ্তানিকারকরা পণ্য পাঠাতে দেরি করছেন, আমদানিকারকদের গুদামজাত ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, আর দেশের সামগ্রিক লজিস্টিক খরচ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বেশি থেকে যাচ্ছে। 

এই অবস্থায় একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন অপারেটরের অংশগ্রহণকে কেবল সন্দেহের চোখে দেখলে বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান কীভাবে হবে, সেই প্রশ্নও আমাদের করতে হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথরিটির সিইও আশিক চৌধুরী যে ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন, তা এই বিতর্কের অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বন্দরে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্নীতি ও দীর্ঘ ওয়েটিং টাইম। প্রতিযোগী দেশগুলো অনেক আগেই বৈশ্বিক অপারেটরদের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর বন্দর ব্যবস্থাপনা চালু করেছে। ভিয়েতনামের কাই মেপ বন্দর তার একটি উদাহরণ, যা আজ বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষ দশে জায়গা করে নিয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর এখনো বহু সূচকে পিছিয়ে। এই ব্যবধান ঘোচাতে হলে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তির বিকল্প নেই।

লালদিয়া টার্মিনাল প্রকল্পটি একটি পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ উদ্যোগ। এখানে সরকারের কোনো আর্থিক বিনিয়োগ নেই। এপিএম টার্মিনালস সাইনিং মানি হিসেবে ২৫০ কোটি টাকা দিচ্ছে এবং নির্মাণকালসহ মোট প্রায় ৬৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। অর্থাৎ ঋণ নিয়ে বা রাষ্ট্রের ঘাড়ে বোঝা চাপিয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বরং ঝুঁকি বহন করছে বেসরকারি অংশীদার। যত বেশি কনটেইনার হ্যান্ডেল হবে, রাষ্ট্রের আয় তত বাড়বে। এমনকি ন্যূনতম ভলিউম নিশ্চিত করার শর্তও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা রাষ্ট্রের স্বার্থকে সুরক্ষা দেয়।

অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, ত্রিশ বছরের চুক্তি কি খুব বেশি দীর্ঘ নয়। বাস্তবতা হলো, বড় অবকাঠামো ও পিপিপি প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বিশ্বব্যাপী স্বাভাবিক বিষয়। ভারত, চীন কিংবা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে এ ধরনের চুক্তির মেয়াদ পঞ্চাশ থেকে ষাট বছর পর্যন্ত। সেই তুলনায় ত্রিশ বছর একটি মাঝামাঝি সময়কাল, যা বিনিয়োগ ফেরত আনা ও মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করার জন্য যুক্তিসংগত।

চুক্তির পূর্ণাঙ্গ দলিল প্রকাশ না করা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এখানে মনে রাখতে হবে, পিপিপি চুক্তিতে বাণিজ্যিক ও অপারেশনাল অনেক সংবেদনশীল তথ্য থাকে। এগুলো প্রকাশ করলে ভবিষ্যৎ দরপত্র প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র দুর্বল অবস্থানে পড়তে পারে। বিশ্বব্যাংক বা এডিবির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাও সম্পূর্ণ চুক্তি প্রকাশের বদলে সারসংক্ষেপ প্রকাশের পরামর্শ দেয়। স্বচ্ছতা মানে সব তথ্য জনসমক্ষে উন্মুক্ত করা নয়; বরং জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট মূল বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে জানানো। এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে মালিকানা, আয় কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সম্পর্কে সরকার ইতোমধ্যেই তথ্য প্রকাশ করেছে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই চুক্তির সম্ভাব্য সুফল বহুমাত্রিক। আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনার ফলে পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ কমবে। বড় কনটেইনার জাহাজ ভিড়তে পারলে সরাসরি বিদেশি বন্দরের সঙ্গে সংযোগ বাড়বে। এতে রপ্তানি দ্রুততর হবে, আমদানির ব্যয় কমবে। শিল্প খাতে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

কর্মসংস্থানের দিক থেকেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ। নির্মাণ ও পরিচালনা পর্যায়ে সরাসরি কয়েকশ মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি পরিবহন, গুদামজাতকরণ, বীমা ও অন্যান্য সহায়ক খাতে হাজারো পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হবে। সবচেয়ে বড় কথা, এপিএম টার্মিনালসের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের তরুণ প্রকৌশলী ও ব্যবস্থাপকরা বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন। এই দক্ষতা ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য বন্দর বা বিদেশি প্রকল্পেও কাজে লাগতে পারে।

প্রযুক্তির ব্যবহার এই চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ডিজিটাল টার্মিনাল অপারেশন সিস্টেম, স্বয়ংক্রিয় কনটেইনার হ্যান্ডলিং, রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং ও আধুনিক কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা বন্দরের স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াবে। এতে কাগজপত্রের জটিলতা কমবে, হয়রানি ও অনিয়মের সুযোগ সংকুচিত হবে। দীর্ঘদিন ধরে যে অভিযোগগুলো বন্দরের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে, সেগুলো থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এটি একটি বাস্তব সুযোগ। এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও এই চুক্তির তাৎপর্য কম নয়। বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা সবসময় অবকাঠামো ও লজিস্টিক সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেন। একটি আধুনিক ও দক্ষ বন্দর থাকলে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে বিবেচনা করার সম্ভাবনা বাড়বে। এতে উৎপাদন, রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ট্রান্সশিপমেন্টে নতুন দিগন্ত খুলে যেতে পারে।

তবে আমি এই কথাও বলব যে, কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, শ্রমিকদের অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই কারণে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো, চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি এবং প্রয়োজনে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা অপরিহার্য। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চুক্তিতে পারফরম্যান্স সূচক, জরিমানা, স্টেপ-ইন রাইট ও চুক্তি বাতিলের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ অপারেটর ব্যর্থ হলে রাষ্ট্র হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।

চট্টগ্রাম বন্দর চুক্তি নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক বন্ধ হওয়া দরকার। সমালোচনা হবে, প্রশ্ন থাকবে, সেটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই সমালোচনা যদি তথ্যহীন আতঙ্ক ছড়ায় এবং উন্নয়নের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দেয়, তাহলে তা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি হয়ে দাঁড়ায়। ড্যানিশ এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে এই চুক্তি কোনো জাদুর কাঠি নয়। আবার সর্বনাশের চক্রান্তও নয়। এটি একটি সুযোগ।

সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের বন্দর খাত নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। তখন হয়তো এই বিতর্কের বদলে আমরাই গর্বের করে বলব যে, একটি সাহসী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত দেশের জন্য নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছিল।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
[email protected] 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!