× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আহসান হাবিব

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ চাঁদাবাজি

আহসান হাবিব

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

রমজান এলে মুসলিম বিশ্বের বহু দেশে বাজারে স্বস্তির হাওয়া লাগে। সৌদি আরব, তুরস্ক, মালয়েশিয়া কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতে সরকার ও ব্যবসায়ীরা যৌথভাবে নিত্যপণ্যের দাম কমাতে উদ্যোগ নেয়—বিশেষ ছাড়, ভর্তুকি, ভ্রাম্যমাণ বাজার, কঠোর নজরদারি। অথচ আমাদের বাস্তবতা প্রায় উল্টো। চাঁদ দেখা যাওয়ার আগেই চাল, ডাল, তেল, চিনি, খেজুর, ছোলা, মাংস—প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, সরবরাহ ব্যবস্থায় ‘অতিরিক্ত খরচ’ যার বড় অংশই চাঁদাবাজি।

উৎপাদক থেকে পাইকার, পাইকার থেকে খুচরা—প্রতিটি ধাপে যদি জোরপূর্বক অর্থ আদায় হয়, তবে তার বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাঁধেই পড়ে। অর্থনীতির ভাষায় এটি ‘ট্রানজ্যাকশন কস্ট’; কিন্তু বাস্তবে এটি ভয়ভীতি প্রদর্শন করে আদায় করা অবৈধ টাকা।

দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে বাস, ট্রাক, সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, টেম্পো-লেগুনা—সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি টাকার মতো চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায় ৩ হাজার স্পট থেকে এই আদায় চলে। কোথাও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার নামে, কোথাও পার্কিং ফি, কোথাও পৌর টোলের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ, আবার কোথাও ‘লাইনম্যান’ খরচ বা ‘গেট পাস’—এভাবেই চলছে চাঁদাবাজি।

পরিসংখ্যান বলছে, সিটি বাস প্রায় ৮ হাজার; প্রতিটি থেকে দৈনিক গড়ে ৮০০ টাকা করে আদায় হলে ৬৪ লাখ টাকা। দূরপাল্লার বাস ৬০ হাজারের বেশি; প্রতিটি থেকে ৫০০ টাকা ধরলে প্রায় ৩ কোটি টাকা। ঢাকায় ১৮ হাজার সিএনজি অটোরিকশা থেকে দৈনিক ১৫০ টাকা করে ২৭ লাখ টাকা। ব্যাটারিচালিত রিকশা—ঢাকায় ১০ লাখ, সারা দেশে আরও প্রায় ৫০ লাখ; গড়ে ৮০-১৫০ টাকা করে দৈনিক কয়েক কোটি টাকা। ট্রাক প্রায় ৪ লাখ; প্রতিটি থেকে ১ হাজার টাকা ধরলে ৪০ কোটি টাকা। টেম্পো-লেগুনা মিলিয়ে আরও লক্ষ লক্ষ টাকা। সব মিলিয়ে অঙ্কটি শতকোটি ছুঁয়ে যায়।

এই বিপুল পরিমাণ টাকা তারা কার কাছ থেকে তুলে নেয়? যাত্রী ও পণ্য পরিবহণের ভাড়া বাড়িয়ে—অর্থাৎ সাধারণ মানুষ থেকে।

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই টাকা আদায় হয় ইচ্ছার বিরুদ্ধে। নির্ধারিত অঙ্ক না দিলে গাড়ি আটকে দেওয়া, ভাঙচুর, এমনকি মারধরের ঘটনাও ঘটে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে ডিজিটাল ভাড়া পরিশোধ ও ক্যামেরাভিত্তিক মামলা পদ্ধতি চালু হলে সড়কে নগদ লেনদেন কমবে, চাঁদাবাজির সুযোগও সংকুচিত হবে। বর্তমানে সমঝোতার নামে যে অর্থ আদায় হচ্ছে, তা তদন্ত করে প্রকৃত সত্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত।

অন্যদিকে শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আব্দুর রহিম বক্স দুদু দাবি করেন, সরাসরি চাঁদা তোলা হয় না; তবে নানা নামে আদায় বন্ধ হয়নি। মালিক সমিতির পক্ষ থেকে সাইফুল আলম বলেন, এটি ব্যবস্থাপনা খরচ, স্বেচ্ছায় দেওয়া ফি। প্রশ্ন হচ্ছে—স্বেচ্ছার সংজ্ঞা কী, যখন চাঁদা না দিলে রাস্তায় গাড়িই নামানো যায় না?

জেলা থেকে জেলায় একই চিত্র

চট্টগ্রামে গত ১৬ বছরে পরিবহণ খাতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠে এসেছে একটি মামলার এজাহারে। রাজশাহীতে বাসপ্রতি ৬২০ টাকা শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের নামে আদায় হলেও তার বড় অংশ তছরুপের অভিযোগ রয়েছে। খুলনায় টার্মিনালভিত্তিক প্রতিটি বাসকে ৩৫০-৫২০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। সিলেটে রসিদের রং বদলালেও চাঁদা বাণিজ্য থামেনি। বরিশালে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, কিন্তু টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন আসেনি। রংপুরে বছরে প্রায় ৭ কোটি টাকা বিভিন্ন খাতে চাঁদা আদায় হয়।

এই চিত্র প্রমাণ করে—এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়া এক অর্থনৈতিক ব্যাধি।

চাঁদাবাজির অর্থনৈতিক অভিঘাত

১. পরিবহণ ভাড়া বৃদ্ধি : ট্রাকচালক যদি প্রতিদিন ১ হাজার টাকা অতিরিক্ত দেয়, তা পণ্যের ভাড়ায় যোগ হবে।
২. সরবরাহ শৃঙ্খলে মূল্যস্ফীতি : উৎপাদক থেকে খুচরা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ‘অদৃশ্য কর’ যুক্ত হয়।
৩. মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস : আয় স্থির, কিন্তু ব্যয় বাড়ে।
৪. বাজারে সিন্ডিকেট শক্তিশালী হওয়া : চাঁদার অর্থ দিয়ে প্রভাবশালী চক্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করে।
৫. প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া : ছোট মালিক বা নতুন উদ্যোক্তা বাজারে টিকতে পারে না।

রমজানে চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বাড়ে। কিন্তু চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগে যদি পরিবহণ ব্যয়, গুদাম ব্যয়, টার্মিনাল ফি সব জায়গায় অতিরিক্ত অর্থ আদায় হয়, তবে দাম কমার বদলে বাড়বেই। মুসলিম বিশ্বের বহু দেশে সরকার ভর্তুকি দেয়; আমাদের এখানে বাজারের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।

অভিযোগ রয়েছে, মালিক-শ্রমিক সংগঠনের একাংশ চাঁদার অর্থে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। সরকার বদলালেও আপসের রাজনীতি বদলায় না। ফলে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। চাঁদাবাজি একটি ফৌজদারি অপরাধ এ কথা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীও স্বীকার করেছেন। 


সমাধানের রূপরেখা

১. স্বাধীন তদন্ত কমিশন : সড়ক, স্বরাষ্ট্র ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ কমিটি; প্রতিবেদন প্রকাশ বাধ্যতামূলক।
২. ডিজিটাল পেমেন্ট ও ই-টিকিটিং : নগদ লেনদেন কমালে অনিয়ম কমবে।
৩. টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা : আয়-ব্যয়ের অডিট প্রতিবছর প্রকাশ।
৪. হটলাইন ও হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা : চালক-শ্রমিক যেন ভয় ছাড়া অভিযোগ করতে পারেন।
৫. রমজানকেন্দ্রিক বিশেষ নজরদারি : চাহিদা বৃদ্ধির সময়ে কঠোর বাজার তদারকি।
৬. রাজনৈতিক সদিচ্ছা : দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা।

চাঁদাবাজি এক ধরনের অদৃশ্য কর, যা জনগণের ঘামঝরা আয়ের ওপর আরোপিত হয়। রমজানের সংযম ও ন্যায়ের শিক্ষার সঙ্গে এই সংস্কৃতি সাংঘর্ষিক।

যদি সত্যিই বাজারে স্বস্তি আনতে হয়, তবে কেবল সিন্ডিকেট ভাঙার কথা বললেই হবে না—পরিবহণ খাতের প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় সরকার বদলাবে, মন্ত্রী বদলাবেন, রসিদের রং বদলাবে—কিন্তু বাজারে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস কোনদিনই বদলাবে না।

লেখক: আহসান হাবিব, (সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা)।

Link copied!